হোম » কথামালা » গ্রন্থালোচনা » কবি ও আমলাকেন্দ্রিক অসুস্থতা_সচ্চিদানন্দ চক্রবর্তী
কবি ও আমলাকেন্দ্রিক অসুস্থতা_সচ্চিদানন্দ চক্রবর্তী

কবি ও আমলাকেন্দ্রিক অসুস্থতা_সচ্চিদানন্দ চক্রবর্তী

প্রবন্ধ সাহিত্যধারার সর্বশ্রেষ্ঠ বিদগ্ধ সৃষ্টি। প্রবন্ধে প্রবন্ধকারের নিজস্ব চিন্তাচিন্তন, মনমনন, ব্যক্তিগত জীবনদর্শন, সমাজচেতনা, মানবতাবোধ ও সমাজ উন্নয়নের সুস্পষ্ট মতামত ব্যক্ত হয়। নিবন্ধ প্রবন্ধানুরূপ ক্ষুদ্রঅবয়ব সৃষ্টি মাত্র। অধ্যাপিকা নীলুফার বেগম একাধারে নিবন্ধকার, প্রবন্ধকার, সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও কবি। ‘‘কবি ও আমলাকেন্দ্রিক অসুস্থতা’’ তার প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ। গ্রন্থটিতে প্রকাশিত নিবন্ধগুলোর আকার আয়তন লেখার বিষয়বস্তু থেকে অনুমেয় যে লেখাগুলো সংবাদপত্রে প্রকাশিত সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় বা সাধারণ কলাম হিসেবে রচিত নিবন্ধকারের ব্যক্তিগত সমাজদর্শন থেকে উদ্ভুত দেশচিন্তা, সমাজকল্যাণমূলক একটা জোরালো সমাধানের নকশা নির্মাণ প্রচেষ্টা। নিবন্ধকারের এ জাতীয় মনমানসিকতা সর্বতোভাবেই ধন্যবাদার্হ, প্রশংসিত ও সুস্বাগত। গ্রন্থের সূচনাপর্বে ‘দু’টি কথা’ শিরোনামে গ্রন্থকার অতি আক্ষেপের সাথে যে কথাগুলো বলেছেন, যেমন মানুষে মানুষে হিংসা, লোভ, দাপট ও রাজনৈতিক পেশীশক্তির ব্যবহার- যা দেখে তিনি ক্ষুদ্ধ, তার প্রকাশ নিবন্ধগুলোতে বিদ্যমান। তবে বিদ্রোহ করতে যেয়েও আপসকামী হয়ে উঠতে হয়েছে প্রবন্ধকারকে, সে কারণও সুধী পাঠকসমাজে দুর্বোধ্য নয়। যেমন বেকার সমস্যার সমাধানের জন্য সরকারের উপর দোষ না চাপিয়ে তিনি নিজেদেরকে কর্মমুখী হবার আহবান জানিয়েছেন। কথাটি শতভাগ সত্য হলেও এদেশের কর্মীদেরকে উৎসাহী উদ্যোগী করতে অবশ্যই একটা পরিচালনা কমিটি, একটা প্রকল্প তৈরির প্রয়োজন অত্যাধিক। কেননা ওই যে চাকরির একটা গন্ধ প্রতিনিয়ত এদেশের যুবসমাজকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। নিজের খামারে মুরগী উৎপাদনে অনীহা থাকলেও কোন প্রজেক্টে চাকরি নিয়ে সেখানে মুরগী লালন পালনে আপত্তি হয় না অনেক যুবকেরই। তাই এ ধরনের প্রজেক্ট ও সরকারি উদ্যোগে তৈরি করলে সুফল দিতে পারে। বেকার সমস্যা এবং কর্মবিমুখ যুব সমাজ।
অতি বাস্তব এবং দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপনে নারীর প্রতিকৃতি। নারীর অলংকার, শাড়ি, প্রসাধনী দ্রব্যের বিজ্ঞাপনে নারীর শোভন ছবি ছাপা যেতে পারে, কিন্তু পুরুষের ধূমপানের চিত্রে নারী নিজহাতে সিগারেটটিতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে এ নিত্যন্তই আপত্তিকর। পুরুষের সেভিং ক্রীমের বিজ্ঞাপনে নারীর কামনাগন্ধ ছবি কেন? নিবন্ধকারের মতো আমারও জিজ্ঞাসা এই। (নারী পণ্যের মূল্যায়নে)
অনাথ এতিম শিশুদের প্রতি সহানুভূতি জাগা প্রতিটি বিবেকবান মানুষেই বিদ্যমান। বাংলাদেশের জাতীয় শিশু কিশোর নিবন্ধটি অত্যন্ত দরদীমন নিয়ে লেখা। তবে নামে কি আসে যায় বাক্যের কথা মনে রেখে বাস্তব কাজ হবে সেটুকু, যেটুকু তিনি করবেন।
‘অর্জন’ পুরো নিবন্ধ বা প্রবন্ধ হয়ে উঠেনি। অর্জনের ভাষা শ্লথ, অনেকটা রম্যরচনা, অনেকটা গল্প বলার ঢংয়ে রচিত, অর্জনে একাধিক দুর্নীতিগ্রস্থদের চিত্র তুলে ধরে লেখিকা সমাজের কল্যাণই চেয়েছেন।
‘পুরুষেরা ক্রমশ নারী নির্ভর হয়ে পড়ছেন’ চমৎকার একটি যুক্তিনির্ভর সাবলীল আলোচনা নিবন্ধ। পরিবার থেকে পরিপূর্ণ সমাজের কল্যাণ পেতে হলে নারী পুরুষ অর্থাৎ স্বামী স্ত্রী উভয়কেই এক মানসিকতা নিয়ে যার-যার উপরে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাবার বিকল্প নেই।
‘কতিপয় বুদ্ধিজীবীর কথা’ একটি বুদ্ধিদীপ্ত রচনা। সাধুবাদ পাবার যোগ্য নিবন্ধটির জন্য নিবন্ধকার।
চিঠি বা ছোট গল্পের আদলে লেখা ‘পরিবর্তন’-এ আছে অনিয়ম অন্যায় দেখে দেখে ক্ষেপে যাওয়া দর্শকের ক্ষোভ প্রকাশে তীব্র কটাক্ষ। মন্দ নয় প্রতিবাদটি।
‘মেয়েদের ভাসমান করে রাখা হয়েছে’ নিবন্ধটিতে নিবন্ধক অতি সুকৌশলে অহংসর্বস্ব সমাজ কর্মকর্তা, বাগাড়ম্বর সর্বস্ব পুরুষ সমাজকে খোঁচা দিয়ে এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যার মর্মার্থ বুঝতে সক্ষম হলে, আর কোন পুরুষই অবৈধভাবে নারীসমাজের প্রতি জোরজুলুম জবরদস্তি করতে প্রয়াসী হতনা, বরং লজ্জায় নতশিরে পিছু হটতো। যেমন নিবন্ধকার বললেন বা প্রশ্ন রাখলেন-‘‘আমার প্রশ্ন মেয়েরা কেন বা কার ভয়ে একাকী বসবাস করতে পারেনা। হিংস্র বাঘ- সিংহের ভয়ে, নাকি নরপশুদের ভয়ে।’’ আরো একটি চমৎকার যুক্তি তুলে ধরেছেন নিবন্ধকার ঃ কোন শ্রদ্ধেয় বক্তাকে তো বলতে শুনিনি নারীরা আমাদের মা- বোন মেয়ে। তাদের দিকে ভুল করেও কুদৃষ্টি দেয়া যাবেনা। পুরুষদের চোখের পর্দা ইসলামের দাবী। তারা কখনো কোন নারীকে উত্যক্ত করতে পারবেনা। যদি করে, –তবে নিশ্চিত জাহান্নাম’’ সম্ভবত এ বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমাধান। নিবন্ধকার আরো মন্তব্য করেছেন ‘‘পাশবিকতাকে ধ্বংস করে পথভ্রষ্ট পুরুষকুলে কি মানবিক সত্তা ফিরিয়ে আনা যায় না? শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় ভক্তাগণ চেষ্টা করলেই তা পারেন। অবশ্যই পারেন। আক্রান্তকে নসিহত করা বেশি প্রয়োজন না আক্রমণকারীকে?’’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রশ্ন। গ্রন্থটির নাম ভূমিকার নিবন্ধটি হচ্ছে- কবি ও আমলাকেন্দ্রিক অসুস্থতা। নিবন্ধটিতে স্পষ্টতই ফুটে উঠেছে গ্রন্থকারের ব্যক্তিগত ক্ষোভ। নজরুলের ভাষায় ‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়েছি”র মতই গ্রন্থকারের বিশেষ ক্ষোভ কবিদের প্রতি আমলাদের বিরুদ্ধাচারণ। প্রতিবাদ এখানে আশ্রয় নিয়েছে ক্ষোভে।
‘নন্দিনী বন্দিনী’তে নারীর অধিকার নিয়ে নারীদের কথা বলা হয়েছে। যদিও নিবন্ধকারে ভাববস্তু বেগম রোকেয়ানুসৃত, তবু নতুন অনেক তত্ত্ব ও তথ্য এতে সংযোজিত হয়েছে।
‘নির্বাচিত কলাম’ বিষয়বস্তুগত দিক থেকে নন্দিনী বন্দিনী মেয়েদের ভাসমান করে রাখা হয়েছে নিবন্ধ-এর মত, তবে কিছু উদাহরণ এসেছে নতুনভাবে।
‘উপরি মাহাত্ম্য’ রম্যরচনাধর্মী নিবন্ধ। একটু হলেও রসালো মানসিকতা নিয়ে লেখা উপরি মাহাত্ম্য মন্দ লাগবেনা পাঠকের। ‘প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসন’ নিবন্ধটিতে অত্যন্ত রুঢ় বাস্তব চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। পুলিশ বাহিনীসহ দেশের সকল যদি এ নিবন্ধের মর্ম উপলদ্ধি করে ভুল সংশোধনে ব্রতী হন, তবে তা হবে দেশের প্রকৃত কল্যাণ।
‘রাজনীতির রসগোল্লা’ সম্পূর্ণরূপেই সংবাদপত্রে প্রকাশিত সম্পাদকীয় কলাম। ভাষা, শব্দ প্রয়োগ পরিপূর্ণ একজন দক্ষ সাংবাদিকের মতই নিবন্ধকার নিবন্ধটিতে ব্যবহার করেছেন।
‘কন্যা জায়া জননী সংবাদ’ নারী সমাজের কতিপয় সমস্যা নিয়ে লেখা। এ নিবন্ধটিও সাংবাদিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লেখা। ‘ ব্যালেন্স’ নিবন্ধটিতোও রম্যরসালো বর্ণনায় সমাজ জীবনের নানা দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। নিজের পিতা পুলিশের কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও পুলিশের দুর্নীতির কথা এ নিবন্ধে উল্লেখ করে সত্যভাষণের দুঃসাহস দেখিয়ে ধন্যবাদার্হই হয়েছেন। ‘স্ট্যাটাস’ নিবন্ধে একজন বিজ্ঞ গণিতবিদের মত গাণিতিক হিসেব কষে নিবন্ধকার চমৎকার যুক্তির অবতারণায় বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন দেশের বেতনস্কেলে সর্বোচ্চ বেতনধারীর আয় ব্যয়ের হিসেবের গরমিল কিভাবে সামঞ্জস্যতা পাচ্ছে সেকি বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে? নিশ্চিত সেই বিলাসী চাকরিজীবীর অবৈধ আয়ের ব্যবস্থাটি পাকা পোক্তই বটে।
‘একসিডেন্ট’ নীলুফার বেগমের তিনটি ছোট গল্পের একটি। সুন্দর সাবলীল বর্ণনায় মধ্যবিত্ত পরিবারের সুখদুঃখের বর্ণনাত্মক মধুর ছোট গল্প। নেই কোন খলনায়কের দুরভিসন্ধি। প্রাকৃতিক ও যান্ত্রিক দুর্ঘটনায় পিতার একসিডেন্ট বর্ণনার সাথে ছাত্রজীবনের স্মৃতি, চারবান্ধবীর ব্যাডমিন্টন খেলার বিবরণে স্নিগ্ধ ছোট গল্প। পাঠকের ভালই লাগবে পড়তে।
‘আকাশের নীল রং’ চমৎকার ছোট গল্প। গল্প তো নয়, যেন কবিতা। সে কবিতা প্রেম হয়ে বিকশিত হবার আগেই ঝরে গেল। পাঠক একটা হর্ষোৎফুল্ল কাহিনির অভ্যন্তরে ঢুকতে না ঢুকতেই হল যবনিকাপাত। এতে অবশ্যই একটু মন খারাপেরই কথা পাঠকের।
‘খন্ড গল্প’ সত্যি খন্ড গল্প। নায়িকা দীনার একটুখানি খন্ড চিন্তা বস্তিবাসী ছেলেমেয়েদের নিয়ে, তাদের পড়াশোনা ও পুনর্বাসন নিয়ে গল্প লেখিকার ব্যক্তিগত সাংবাদিকতা প্রসূত অভিব্যক্তিতে সিক্ত খন্ড গল্প।
নীলুফার বেগম ব্যক্তিগত জীবনাদর্শে কিছুটা হলেও বামপন্থী। তাই তার ‘বাবুই পাখি’ কবিতায় রূপক বাবুই পাখিকে নতুন বুর্জোয়াদের থেকে দূরে থাকার আহবান জানিয়েছেন। তিনি মৌলিকভাবেই বুর্জোয়াবিরোধী।
‘মৃত্যু দ- চাই’ কবিতায় কবি কোন ঘোর প্যাচালো কথা নয়, কঠিন তত্ত্বদর্শন নয় সোজাসুজি পশ্চিমা অপশক্তির পতন চেয়েছেন। ‘হেবা ধারগমের জন্য’ কবিতায় চেয়েছেন ফিলিস্তিনি বিপ্লবের সাফল্য। পতন চেয়েছেন ইসরাইলি আগ্রাসন-অত্যাচার। ‘শিশুরা’ কবিতায় শিশু হতে চাওয়ার মধ্যে কবির মনের সারল্য প্রকাশিত হয়েছে। শিশু নীরোগ দেহের প্রতীক।
‘পোয়েটস’ সিটি কবিতা স্বপ্নময় জগতে জনাকীর্ণ কোলাহল মুখর শহরে একটু শান্তি নিবাসের প্রত্যাশা। ‘কীট’ রূপক কবিতা দালাল ফড়িয়া দুঃশাসক সবাই কবির চোখে কীট স্বরূপ। ‘কি চাওয়া তোমার’ কবিতায় কবির রোমান্টিক ভাবনা ব্যক্ত হয়েছে। নিঃসীম শূন্যতার মরুভূমির নির্জনতা, সমুদ্রের অতলান্তিক অথৈ পানির গভীরতা সবই কবির শূন্যতার পরিমাপক মাপকাঠি যেন।
সার্বিক বিচারে নীলুফার বেগম সুন্দর মনের বড় মাপের সাংবাদিক হয়ে উঠতে উঠতে গল্পকার, কবি ও প্রবন্ধকার হয়ে উঠেছেন। মূলত তিনি একজন অধ্যাপিকা অর্থাৎ শিক্ষার যে ক‘টি শাখা রয়েছে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ শাখায় তার বিচরণ। সে বিচরণের স্বাক্ষর রয়েছে তার সামগ্রিক রচনায়।
একটি পরিচ্ছন্ন প্রচ্ছদে ঝকঝকে ছাপা গ্রন্থটির চাঁদেও কলঙ্করূপ রয়ে গেছে কিছু ভুল বানান। আশা করব এই বইটির দ্বিতীয় মুদ্রণে প্রকাশক এদিকটায় তীক্ষ দৃষ্টি দেবেন। ‘কবি ও আমলাকেন্দ্রিক অসুস্থতা’ নামক গ্রন্থটি এ সময়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি  গ্রন্থ। বইটি সবশ্রেণির পাঠকেরই পাঠকরার প্রয়োজন রয়েছে। প্রকাশক-আশালতা প্রকাশনী, প্রচ্ছদ-আইয়ুব আল আমিন, পৃষ্ঠা সংখ্যা-৬৪, মূল্য-১৬০.০০টাকা মাত্র।

আরও দেখুন

কবি সুফিয়া কামাল সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

কবি সুফিয়া কামাল : সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

নারী জাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত। নারী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী। সমাজ ...

Leave a Reply