হোম » মনন » প্রবন্ধ » কবি সুফিয়া কামাল : সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী
কবি সুফিয়া কামাল সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

কবি সুফিয়া কামাল : সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

নারী জাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত। নারী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী। সমাজ সংস্কার ও সাহিত্য সেবার সর্বজয় শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব কবি সুফিয়া কামাল। উনবিংশ শতকের প্রথম থেকেই নারী উন্নয়নের ধারা ও নারী অধিকার জাগরণের মুক্তির চেতনায় নারী সমাজের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমনের সঙ্গী ও মশালবাহী ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। বাংলায় নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার পথ অনুসরণ করে পরবর্তীতে যিনি নারী সমাজের আলোকবর্তিকা হয়ে অভিভূত হয়েছেন তার মধ্যে সুফিয়া কামাল বর্তমান নারী সমাজের সর্বত্র আপন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের জন্য তার কষ্ট ছিলো সদা সোচ্চার। নারী সমাজের নির্যাতন ও বিদ্যমান নানা বৈষম্য তাকে করেছে পীড়িত। তাইতো সমগ্র জীবনব্যাপি তিনি এগিয়ে এসেছেন নারী সমাজের কল্যাণে। তার প্রেরণায়। মুক্তিপথের দিশা পেয়েছে অনেক নারীরা। তাইতো তার কোমল প্রশান্তি ও কঠোর জীবন সাধনায় লিপ্ত সংগ্রামী চেতনা সর্বত্র বিরাজমান ছিলো।
কবি সুফিয়া কামালের জন্ম ২০ জুন ১৯১১ সালে (১০ই আষাঢ় ১৩১৮ বঙ্গাব্দ) বরিশালের শায়েস্তাবাদ নবাব পরিবারে। মাতামহ সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন কনিষ্টা কন্যা সৈয়দা সাবেরা খাতুনের কোল জুড়ে জন্ম নেয় সুফিয়া কামাল। পিতা ত্রিপুরা জেলার শিলাউর গ্রামের সৈয়দ আবদুল বারী বিএল। একভাই সৈয়দ আবদুল ওয়ালী ও বোন সুফিয়া কামাল পিতার সাহচর্য পেয়েছিলেন জন্মের কয়েক বছর মাত্র। সাত বছর বয়সে বাবা সৈয়দ আবদুল বারী সুফীবাদে আকৃষ্ট হয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। তাই সুফিয়া কামালকে বড় হতে হয়েছে নানার বাড়ীতে। শায়েস্তাবাদের এই নবাব পরিবারের ছিলো বিপুল ঐশর্য। মান সম্মানে ধনে-জনে শিক্ষায় ছিলো বিখ্যাত পরিবার। বরিশালে তৎকালীন স্বদেশী আন্দোলনের প্রবল চেতনা এই পরিবার কেউ স্পর্শ করেছিলো। মামা ব্যারিষ্টার সৈয়দ মোতাহের হোসেন জড়িয়ে পড়েছিলেন অসহযোগ ও আন্দোলনে। বাবার দেশ ত্যাগের অপ্রত্যক্ষ প্রভাবের পাশাপাশি যার প্রভাব সুফিয়া কামালের ছেলেবেলায় প্রভাবিত করেছিলো তিনি মাতা সাবেরা খাতুন। বিশাল সামাজিক সাধনায় ও জীবনের চরম বঞ্চনায় অটল ও অকুতোভয় প্রেরণা লাভ করেছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল মায়ের কাছ থেকে। পরবর্তী জীবনে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সুফিয়া কামালকে তার পারিবারিক জীবনের মধ্য দিয়ে সাহিত্য পত্রিকা ও গল্প পড়তে পড়তে সাহিত্য চর্চায় বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। মাত্র বার বছর বয়সে ১৯২৩ সালে বড় মামার আপন ভাইয়ের ছেলে সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয় সুফিয়া কামালের। মায়ের কাছে শেখা বাংলা ভাষা, উদার সংস্কৃতিমানা সমাজ সচেতন একজন মানুষ নেহাল হোসেনের সহযোগীতায় সুফিয়া কামাল আরো পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। শায়েস্তাবাদ থেকে বরিশাল নিজের কর্মস্থলে গিয়ে নতুন জীবনে (১৯২৫-২৬) সুফিয়া কামাল নিজেকে পরিবর্তনের নতুন পরিবেশ পেয়েছিলেন। স্বামীর উদার মানসিকতায় তার স্বশিক্ষা, সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ তাকে আধুনিক পরিবেশের সাথে নিবিড়ভাবে পরিচিত করে তোলে। তার সাহিত্যিক চেতনার প্রথম পরিচয় পাওয়া যায় বরিশাল জেলার তরুণ নামে একটি পত্রিকায়। মাত্র ১২ বছর বয়সে লেখা “সৈনিক বধু” নামে ছোট গল্পটি প্রকাশের মধ্যে দিয়ে। এরপর মাত্র ১৫ বছর বয়সে কলকাতায় সওগাত, পত্রিকায় তার প্রথম কবিতা ‘বাসন্তি’ প্রকাশের সাথে সাথে সাহিত্যক্ষেত্রে তার উদ্যোগ, দৃঢ়তা, সাহসী চেতনাকে স্বকীয় রূপ দান করেছিলো। সেই সময়ে মুসলিম সাহিত্য গোষ্ঠী গড়ার ক্ষেত্রে সওগাত সম্পাদক মুহাম্মদ নাসির উদ্দীনের সওগাত পত্রিকায় নারী ও পুরুষ ১ লেখকদের লেখা আহ্বান সুফিয়া কামালের সাহিত্য ক্ষেত্রে পরির্পুন আবির্ভাবের মতো। তাছাড়াও সমাজ সচেতন, চারিত্রিক দৃঢ়তা, ঐতিহ্য সচেতন ও দায়িত্ববোধ সম্পন্ন সুফিয়া কামালের চেতনাকে যারা সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, কবি খান মোহাম্মদ মইনুদ্দীন, কবি বেনজীর আহমদ অন্যতম।
অন্যদিকে প্রথম স্বামী নেহাল হোসেনের বন্ধুতা হৃদতা ও সংস্কৃতিমনা সহযোগিতা কবি সুফিয়া কামাল হারালেন ১৯৩২ সালে। হঠাৎ এক জটিল যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে স্বামী নেহাল হোসেন মৃত্যুবরণ করলে সুফিয়া কামালের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। এক শিশু কন্যা ও মাকে নিয়ে বরিশাল চেড়ে চলে আসেন কলকাতায়। (১৯৩২-৩৯) এই সাত বছর সময় সুফিয়া কামালের জীবনের তাৎপর্যময় সময়। এই নিঃশব্দ জটিল জীবনে তার একান্ত আশ্রয় হয়েছিলো সাহিত্য সাধনা। সেই সময় সর্বক্ষনের সঙ্গী হয়েছিলেন তার কবি মুহম্মদ মঈনুদ্দীন, সাদাত আলী আখন্দ, কবি বেনজীর আহমদ, বেগম মরিয়ম মনসুর ছিলেন সর্বক্ষনের সাথী। পত্র থেকে দুই পরম বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন সেই সময় সাহিত্যিক আবুল ফজল ও সাহিত্যিক মাহবুবুল আলম। সেই সময়ে পরম বন্ধুর কাছে দুটো চিঠিতে তিনি তার জীবনের অর্ন্তদহনের কথা অকপটে তুলে ধরেছিলেন- ১৯৩৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আবুল ফজলের কাছে সুফিয়া কামাল এক পত্রে লিখেছিলেন ‘একাকী জগতে আমার শক্তি সামান্য, চারদিকের নিষ্পেষনে আমি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছি। আমাদের সমাজে বিধবার অবস্থা আপনাকে কি বলতে হবে নতুন করে? বিধির বিধানের ওপর মানুষের বিধান বড় ভয়ানক? আমি কিছুই করতে পারছিনা। একই বিরহের কবিতা লিখে আমারই  বিরক্ত ধরে গেছে। যদি তখনও দুঃখিত হতাম না। কিন্তু সূর্যমুখীর উর্ধ্বমুখী বিলাসই শুধু দেখবেন তার বিকাশ বেদনা কি দেখবেন না? একই সময়ে ২০ তারিখে সাহিত্যিক মাহবুবুল আলমকে লিখেছিলেন কবি সুফিয়া কামাল একপত্রে- “আমি কবি। কঠোর অবরোধ প্রবলতর আভিজাত্যের মধ্যে থেকে ছিটকে পড়েছি। এতোগুলো অপরাধের বোঝা বয়ে আমি ক্লান্ত। তার উপর মন আমার নিঃসঙ্গী।
(সুফিয়া কামাল)।
সুফিয়া কামালের ব্যক্তিজীবনের দুঃসময়ের একান্ত বন্ধু হয়ে এলেন ১৯৩৯ সালে সাহিত্যপ্রেমী ও উদার মানবিক চেতনার মানুষ অসাধারণ ব্যক্তিত্ব কামাল উদ্দিন খান। দ্বিতীয় স্বামী কামাল উদ্দিন খানের সংবেদনশীল সমর্থন পেয়ে অচিরেই নতুন জীবন লাভ করলেন সুফিয়া কামাল। ১৯৪৭ সালে ২০ জুলাই মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের সচিত্র বেগম পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করে। যার সম্পাদক ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল এবং ১৯৪৭ কামাল স্বামী ও সংসারের তাড়নায় চলে আসেন ঢাকায়। কামাল উদ্দিন খান ও সুফিয়া কামালের উভয়ের জন্য নতুন শহর ঢাকা হলেও মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সওগাত ও বেগম পত্রিকা নিয়ে ঢাকা চলে এলে তার সঙ্গে লুকিয়ে কামালের নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের ছত্রছায়ায় তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠেন। পঞ্চাশের দশকে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও কুমিল্লায় যেকোন সাহিত্য সম্মেলনে তার উপস্থিতি ছিলো উজ্জ্বলতর। তার তারাবাগের ঢাকার বাড়ীতে পঞ্চাশের দশকের প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং এই বাড়ীর আঙিনাতে আয়োজিত সভা থেকে জন্ম নেয় আজকের কঁচিকাচার আসর।
সুফিয়া কামালের প্রথম প্রকাশিত লেখা ছিলো গদ্য ১৯২৩ সালের একটি গল্প ‘সৈনিক বধু’ প্রকাশিত হয় এবং প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থটিও ছিলো কেয়ার কাঁটা। ১৯৩৭ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত গ্রন্থের প্রকাশক ছিলেন কবি বেনজীর আহমদ। “কেয়ার কাঁটা যখন প্রকাশিত হয় তখন সেই সময়ে বাংলা সাহিত্য ছোটগল্পের সংখ্যা ছিলো খুব কম। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র এক্ষেত্রে ছিলেন পথিকৃৎ। এই স্তরের ছোটগল্পের লেখিকা হিসাবে সুফিয়া কামালের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সুফিয়া কামালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ “সাঝের মায়া” ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় যার প্রকাশক ছিলেন কবি বেনজীর আহমদ। মানবিক জীবনের প্রতিচ্ছবি, প্রকৃতির রহস্যময় অস্তিত্ব চেতনা, মমত্ববোধ ও আধুনিক মননে কবির কবিতা আপন শক্তিতে ঐশর্য্য জ্ঞানসত্তার নতুন আলোক বর্তিকা হিসাবে। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় শ্রাবণ ১৩৭১ বঙ্গাব্দে। এই কাব্যগ্রন্থটি কবি সুফিয়া কামাল সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনকে সর্গ করে উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন যার সতর্ক স্নেহছায়ায় আমার সাহিত্য জীবনের বিকাশ শ্রদ্ধাস্পদেষু। কাব্যগ্রন্থের গ্রন্থেয় কবিতা জীবন স্বপ্নে জীবনের সংঘাতময় সময়ের চিত্র এঁকেছেন- যেমন-
“আমার জীবন স্বপ্নে কতবার লেগেছে আঘাত
ব্যথার পাষার স্তুপে কত রূপে লভেছে সংঘাত।
সে আঘাতে প্রাণ বহ্নি জ্বলিয়া উঠেছে উর্ধ্ব শিখ,
সে আঘাত চিহ্ন হল ললাটে আমার জয়টিকা।
—————————————–
কত স্বপ্ন হল শেষ, কত সত্য লভেছি জীবনে
সেত নয় তুচ্ছ, তাই সেই স্বপ্ন ভরিয়ে পরানে
জীবনের স্বপ্ন ভরিয়ে পরানে
জীবনের স্বপ্ন হেরি নব নব রূপে প্রতিদিন
কোথায় বেদনা। সে যে জীবনের রূপ অমলিন” (জীবন স্বপ্ন-উদাত্ত পৃথিবী)

তিনি কবিতাকে কখনো জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেননি। জীবন থেকে উৎসারিত যত স্বপ্ন সময়ের ধারায় জীবনের অর্ন্তনিহিত অনুভূতিতে হয় একাত্ববোধ। কবিতায় তিনি জীবনযাপনের বাঁকে যে সংগ্রাম করে গেছেন। নারী, স্ত্রী ও মা হিসাবে তাই কবিতার বিষয়বস্তুতে, অনুভূতিতে, জীবনের প্রতিচ্ছবির মতো স্বরূপ নির্মাণে হয়েছে সোচ্ছার। ব্যক্তিগত শোক, অন্তঃদহ কবিতাতে উঠে এসেছে বারবার প্রতীকী রূপে। সুফিয়া কামালের সাহিত্য ধারায় যাদের প্রভাব সুফিয়া কামালের লেখনিতে প্রভাব বিস্তার করেছিলো তারা হলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। দুজনই সুফিয়া কামালকে তার কবি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন। তার কাব্য প্রতিভার প্রশংসা করে তাকে পত্র দিয়ে অনুপ্রাণিত করেছেন। সুফিয়া কামালের ‘সাঝের মায়া’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর প্রকাশক কবি বেনজীর আহমদ কাব্যগ্রন্থের একটি কপি রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার কাব্য প্রতিভাকে স্বাগত জানিয়ে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন “তোমার কবিত্ব আমাকে বিস্মিত করেছে। বাংলা সাহিত্য তোমার স্থান উর্ধ্বে এবং ধ্র“ব তোমার প্রতিষ্ঠা। আমার আশির্বাদ গ্রহণ করো রবীন্দ্রনাথ। কবির সুফিয়া কামালের “সাঝেরমায়া” কাব্য গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। বইটি প্রকাশের পর নজরুলের হস্তগত হলে নজরুল সুফিয়া কামালকে ‘সাঝের মায়া’ নিয়ে দীর্ঘপত্রে লিখেছিলেন কল্যাণীয়া, “সাঝের মায়া” কবিতাগুলি সাঝের মায়ার মতই যেমন বিষাদ-ঘন, তেমনি রঙীন, গোধুলীর রংয়ের মত রঙ্গীন। এই সন্ধ্যা কৃষ্ণা তিথির সন্ধ্যা নয়, শুল্কা চতুদ্দশীর সন্ধ্যা। প্রতিভার পুর্ণচন্দ্র আবির্ভাবের জন্য বুঝি এমন বেদনা পুঞ্জিত অন্ধকারের, বিষাদের প্রয়োজন আছে। নিশীথ-চম্পার পেয়ালীয় চাঁদনীর শিরাজী এবার বুঝি কানায় কানায় পুরে উঠবে। বিরহ যে ক্ষতি নয় “সাঝেরমায়া”ই  তার অনুপম নিদর্শন। এমন কবিতার ফুল ফোটাতে পারলে কাব্য মালঞ্চের যেকোনো ফুলমালি কবি নিজেকে ধন্য মনে করতেন। কবি সুফিয়া এন হোসেন বাঙলার কাব্যগগনে নবোদিত উদয়তারা। অন্ত তোরন হতে আমি তাঁকে যে বিস্মিত মুগ্ধ চিত্তে আমার অভিবন্দনা জানাতে পারলাম। এ আনন্দ আমার স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কাজী নজরুল ইসলাম (১লা শ্রাবণ- ১৩৪৫)। তার সকল কবিতায় নিয়ত উপস্থিতি, সংযোগ, ঐক্য মানবতাবোধ প্রকাশ পেয়েছে। তার জীবনের অনিঃশেষ বহমান কর্ম জীবন তার কবিতাকে নিয়ত করেছে সমৃদ্ধ। তার জীবন যাপনের প্রতিটি সময়ে যে সংগ্রাম মুখর দিনযাপন করেছেন তাতে তার চিন্তার ব্যাপকতা, বিস্তার, জীবনের প্রতিচ্ছবি, প্রাথিত প্রেমের বেদনা, গভীর নিসা তার কবিতাকে করেছে বিশ্বজনীন। তিনি আপন শক্তি, মহত্বে এবং মানবিকাতায় নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় কবিতা লিখে গেছেন নিয়ত। কবি সুফিয়া কামালের জীবর্দশায় ১৭টি গ্রন্থের মধ্যে বারটি তার কাব্যগ্রন্থ এবং বাকী গ্রন্থগুলোর মধ্যে আত্মজীবনী, ছড়া, একাত্তুরের ডায়েরী ও আত্মস্মৃতি ত্রকালে আমাদের কাল) উল্লেখযোগ্য। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে সাঝের মায়া, মায়াকাজল, মন ও জীবন, দাওয়াত, প্রশান্তি ও প্রার্থনা, অভিযাত্রিক, উদাত্ত পৃথিবী, মৃত্তিকা ঘ্রান, স্বনির্বাচিত কবিতা সংকলন, ছাড়াও ইতুল বিতুল ছড়া, সোভিয়েতের দিনগুলি ভ্রমন (১৯৬৮), একালে আমার কাল (আত্মজীবনী), একাত্তুরের ডায়েরী (১৯৮৯), মুক্তিযুদ্ধ মুক্তির জয় প্রভৃতি অন্যতম।
সুফিয়া কামাল উজ্জ্বলতম হয়ে আছেন আমাদের সমাজ প্রগতির আন্দোলনে, বাংলার নারীকে তার অধিকার অর্জনের প্রত্যয় ও আস্থা যোগানোর পথ চলায়। নিপীড়িতদের সঙ্গে মিলিত সংগ্রাম, তাদের ভালবাসায় নিজের সময়কে বিসর্জন করা, ছাড়াও সাহিত্য চর্চায় পাশাপাশি নিজেকে ‘ক্রমশ নিজের জড়িয়ে নেন রাজপথের আন্দোলনের উত্তলতায়, তাইতো ষাটের দশকের পর থেকে তিনি ক্রমান্বয়ে হয়ে পড়েছেন সাংস্কৃতিক বিকাশের নানামুখী কর্মকান্ডের প্রধান কান্ডারীরূপে। ১৯৬১ সালের রবীন্দ্র জন্মশত বর্ষের সূত্র ধরে যে সাংস্কৃতিক জাগরণের যে সূচনা ছায়ানটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে তা সংহত রূপ লাভ করে সুফিয়া কামালের প্রচেষ্টায়। সেই ধারাবাহিকতায় স্বাধীকার আন্দোলন, প্রভৃতি চেতনায় সুফিয়া কামালের নিরলস কল্যাণ সাধনা ও বিকাশ কর্ম নতুন তাৎপর্য লাভ করে। তাইতো সকল কর্মে তার যে সত্তা উদ্ভাসিত হয়েছে তার মূল শক্তি নিহিত ছিলো তার চিরন্তন বাংলার মূর্ত প্রতীকে। সুফিয়া কামাল সংগ্রামী চেতনায় ১৯৫৬ সালে দিল্লিতে সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেন। তার নেতৃত্বেই ঢাকায় বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত স্মৃতি কমিটি গঠিত হয়। ঢঅকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম হলের নাম রোকেয়া হল করার প্রস্তাব তিনিই পেশ করেন। ১৯৬১ সালে ছায়ানট প্রতিষ্ঠা হলে তিনি এর সভানেত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে নারী কল্যাণ সংস্থা ও পাক-সোভিয়েত মৈত্রী সমিতির সভানেত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে মস্কোয় আন্তর্জাতিক নারী দিবসে যোগ দেন তিনি। ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদ গঠিত হলে তার এবং সমাজ উন্নয়ন সংস্থার সভানেত্রী নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলনে ঢাকায় মহিলাদের সমাবেশের মিছিলের নেতৃত্ব দেন তিনি। নিজ বাড়ীতে অবস্থান করে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতার করেন তিনি, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বলিষ্ট নেতৃত্ব দেন। ১৯৮২ সালে রবীন্দ্র সংঙ্গীত সম্মেলন পরিষদের ও ১৯৮৮ সালে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভানেত্রী ছিলেন সুফিয়া কামাল।
সাহিত্য সমাজ নির্মাণের পথ চলায় কবি সুফিয়া কামাল পেয়েছেন দেশ ও বিদেশের অসংখ্য পুরষ্কার ও সম্মান। জাতীয় পর্যায়ে বাংলা একাডেমী (১৯৬২), একুশে পদক (১৯৭৬), লেলিন পদক, নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৭৭), মুক্তবীরা মহিলা পুরষ্কার, কুমিল্লা ফাউন্ডেশন পুরষ্কার, নতুন চন্দ্রসিংহ স্বর্ণপদক, জাতিসংঘ সমিতির পুরষ্কার, অনন্যা নারী পদক, কবি জসিম উদ্দিন পদক, শহীদুল্লাহ কায়সার স্মৃতি পদক, মহিলা পরিষদ সংবর্ধনা ছাড়াও অসংখ্য পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তার কবিতা অনূদিত হয়েছে। যেমন- জার্মান, রাশিয়া, চীন, ইতালী, চেক, ভিয়েতনাম, হিন্দি, গুজরাট ও উর্দুতে। কবি সুফিয়া কামালের লেখনি সবসময় মুক্তি আন্দোলনের কথা বলেছে, বাঙালি মুসলমানের নারী শিক্ষা, নারী জাগরণ, ধর্মীয় বিদ্যাচর্চা, সর্বোপরী আদর্শ নারী হিসাবে গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালান সবসময়। তিনি নারীকে দিয়ে শিকার আলো চালিয়ে নারীকে সৃষ্টিশীল মনোভাব সম্পন্ন মানুষরূপে তাদের উন্নত সমাজ গঠনের চেষ্টায় রত ছিলেন।
তাইতো বাংলাদেশের সাহিত্য সমাজে জন্মশতবর্ষে এসে কবি সুফিয়া কামালের জীবন দর্শন, সাহিত্য সাধনা, তার গান আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সম্পদ হয়ে আছে। বর্তমান সমাজ নির্মাণের ধারায় তার প্রগতির আন্দোলন সকল ক্ষেত্রে অনুসরণ করলে তার নারী উন্নয়নের চিন্তা, সাহিত্য চর্চায় নারী শিক্ষার চেতনা চিরকালের কল্যাণরূপী নারী হিসাবে সবার মাঝে ভাস্কর হয়ে থাকবেন সাহসিকা নারী কবি সুফিয়া কামাল।

তথ্যসূত্র ঃ
সুফিয়া কামাল রচনা সমগ্র, সাজেদ কামাল, বাংলা একাডেমী ঢাকা, বেগম সুফিয়া কামাল-অনন্য এক নারীর কথা-খুরশীদ জাহান, সংগীত সংস্কৃতি-জাতীয় রবীন্দ্রসংঙ্গীত সম্মেলন স্মারক- ১৪০৭, ঢাকা, তাপসী সুফিয়া- মালেকা বেগম-প্রথম আলো ২২ জুন ২০০৭, একালে আমার কাল-সুফিয়া কামাল (আত্মস্মৃতি), শ্রাবণ প্রকাশনা, ফেব্র“য়ারি ২০০৮, ঢাকা। সাক্ষাৎকার- সুফিয়াকামাল, দেশকাল, সম্পাদক: ওহীদুল আলম, ডিসেম্বর ১৯৮২, চট্টগ্রাম।

আরও দেখুন

আল-আকসা মসজিদে আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে_এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

আল-আকসা মসজিদে আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে_এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

আল-আকসা মসজিদকে কেন্দ্র করে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ফিলিস্তিন। মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র স্থান আল আকসা ...

Leave a Reply