হোম » সৃজন » কবিতা » গোলাম মোরশেদ মিলন’র কবিতা
গোলাম মোরশেদ মিলন

গোলাম মোরশেদ মিলন’র কবিতা

অন্ধকারের যাত্রাপালা

আজ জীবনজুড়ে চলে, উটকো ”অন্ধকারের যাত্রাপালা”
সতত দলীয়সঙ্গীত গায় বখাটে বেদনার দল,
সারা-রাতভর চলে উলুঙ্গ নৃত্য, উদ্ভট দাপাদাপি।
চলে যন্ত্রণাময় বেশুমার বিচ্ছেদী গান-বাজনার শ্রাদ্ধ।
স্বপ্নের আকাশ গুম হয়ে যায় হতাশার রাজ্যে
আশাহত স্বপ্নেরা আজ আত্নহত্যার পথ খুঁজে নাকাল।
পূর্বাশার আলো আর বুঝি হয় না দেখা-
আর বুঝি রঙধনু রঙমাখা হয় না আমার।
মরুময় মনে আর বুঝি ফুটবে না ফুল,
আর বুঝি ডাকবে না কোকিল- কুহুকুহু সুমধুর।
দৃষ্টির চারপাশ জুড়ে শুধু মরিচিকা আর আলেয়া
কলিজায় বসে বিরাম করে দুঃস্বপ্নের নর্তকীরা।
কাঠ কাটা শব্দে হৃদপিন্ড কাটে বিরহী শুয়োপোকারা-
যেন শেষ নেই এ যাতনাময় নীল যাত্রাপালার!

বিমর্ষ সময়

বিমর্ষ সময় হাবুডুবু খায় অরাজকতার মহাসমুদ্রে,
কিনার খুঁজে বেহুঁস হয়ে পড়ে থাকে হাঙরের মুখে।
কর্ণকুহর ভেদ করে কুৎসিত ঢেউয়ের গগণবিদারী আওয়াজ
মুহূর্মুহূ হামলে পড়ে শরিরে
খুবলে খেতে চায় রক্ত-মাংস।
নোনাজলে ডুবে যায় চোখ
অসাড় হয়ে আসে শীড়া-উপশীড়া।
কলিজার ভিতরে মিটিমিটি জ্বলে তবু আলো
হয়তো সময় এলো বেঁচে ফিরবার!
ফেরা হয় না তবুও
উষ্ঠাগত প্রাণ।

অবগাহন

আমার সুখানুভূতির অষ্টপ্রহরজুড়ে
তোমার অবাধ বিচরণ।
আমার আষ্টেপিষ্টে লেপ্টে আছে
তোমার প্রেমের আভরণ।
তোমার চুলের গন্ধ আমার নিত্যদিনের সুগন্ধি।
তোমার হরিণচোখের প্রণয়স্নাত চাহনিতে হয় অবগাহন।

শুধু তোমার জন্য

সুদীর্ঘকালের চলাচল আমার
হৃদয়পুরের অলিতেগলিতে তোমার।
সুদীর্ঘদিনের মিতালী তোমার চুল ও দুলের গন্ধের সাথে
সাথীহারা ডাহুক খুঁজেফিরে নিশিভর প্রেয়সীর আস্তিন।
বিক্ষতমন আজ বড়ই আনমনা
শুধু তোমার জন্য।।
বেমালুম ভুলে আছো তুমি
মহাকাশভ্রমণের আহত ইচ্ছাগুলো,
সেই শিমুলতলীর ফাগুনরাঙা হাসি
আর বাদামের খোসাখামচে ধরে স্মৃতির পদাবলী।
অস্ফুটে আসে কিছুশব্দ কিছু মোলায়েম ধ্বনি।
পুষ্পঅর্ঘের মতো গেঁথে রেখেছি স্মৃতির তাজবিহ্
শুধু তোমার জন্য।।
অবুঝআশায় তবু বাঁধি বুক।
হয়তোবা আবার আসবে ফিরে
সেই চিরচেনা ভুট্টার আলে
একগোছা ঘাসফুল হাতে বলবে-
শুধু তোমার জন্য।

অভিশপ্ত কালোথাবা

চাপাকষ্টের অষ্টপ্রহর নির্যাতনে হই নীল।
অনবধি পুড়ে যায় মন চক্ষুদ্বয়ে বহে ঝিল।
ঢুঁ-মারে বেদনারা সহসা এফোঁড়ওফোঁড় বুক,
দুখের এই অধ্যায়ে নেই একরত্তিসম সুখ।
স্বপ্নগুলো আজ পরাভূত অতিশয় নিষ্প্রতিভ,
যন্ত্রণাকীটে দংশিত হই তার লকলকে জিভ।
অবহেলা অপমানে আজ ক্ষত-বিক্ষত অন্তর,
দৈব্যবিড়ম্বনায় অতিষ্ঠ আমি হয়েছি যন্তর।
অভিশপ্ত বেকারত্বের কালোথাবা বেশুমার,
চুরমার করে এই আমাকে সব করে ছারখার।

হাহাকারের গান

মরম জ্বালা বাড়ছে ভীষণ নিত্য,
দুঃখবেদন করছে তাড়া
সুখপাখিটা বাঁধনহারা
তুষানলে পুড়ছে আমার চিত্ত।
মনের আকাশ মেঘে ঢাকা অদ্য,
আলোর আশা কল্প-রাজে
ব্যস্ত ভীষণ গল্প-কাজে
বুকটা আমার ভেঙে গেছে সদ্য।
গভীররাতে ডাহুক পাখির কান্না,
কোন দুখে সে কাঁদে বেঘোর
বুকটা করে এফোঁড়ওফোঁড়
দুঃখ-তাপে কলিজা হয় রান্না।
নদীর জলে ভেসে গেছে আশা,
ঢিল ছুড়ে যাই নদীর জলে
তারা গুনে সময় চলে
নিকষকালো আঁধার আমার বাসা।

প্রিয়মুখ

আজও বাবার আঙ্গুল ধরি স্বপ্নে-
তরতর করে হেঁটে যাই মসজিদে।
”চল বেটা, খোদার সাথে মোলাকাত করবি”
ঠিক এভাবেই বলতেন বাবা।
মাঝে মাঝেই ভাবি এসব
স্মৃতির জলে ডুবসাঁতার খেলি।
রোজভোরে বাপ-বেটা হাত-ধরাধরি করে বের হতাম,
ঘুরে বেড়াতাম গাঁয়ের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ।
এপ্রান্ত হতে ওপ্রান্তে, এপাড়া হতে ওপাড়ায়।
কতেক বাঁশঝাড় আর ক্ষেতের আলমাড়িয়ে প্রতিদিন, নগ্নপদে।
কিচিরমিচির সুরে আমাদের অভিবাদন জানাতো
বেসুমার ভোরের পাখিরা।
বাবা বলতো- নে, সকালের বাতাসটা বুকে ধর”
খুবই স্বাস্থ্যবর্ধক, বলতে পারিস মহৌষধ।
আজ প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ ঘুঙ্গুরের মতো বাজে
প্রতিটি বাণী, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষর।
এমন উজ্জীবিত ভরাট স্বর আজ আর শুনি না,
স্মৃতির চিলেকোঠায় হাতরে ফিরি প্রতিক্ষণ-
নোনাজলে ভেসে যায় বুক,
খুঁজেফিরি বাবার হাস্যোজ্জল শ্মশ্রুমণ্ডিত প্রিয়মুখ।

প্রেয়সী আমার

চিরসুন্দরী সুফলা প্রেয়সী আমার।
একদা তোমার রূপের আগুনে
ঝলসে যেত তাবৎ প্রেমিকগণের কলিজা।
আহা ! কী অপরূপ রূপ তোমার।
কী অসীম ক্ষমতা মন কেড়ে নেয়ার।
এইতো সেদিনও-
তোমার হৃদপিণ্ডের উপর দিয়ে কলকল করে বয়ে যেত খরস্রোতা “করতোয়া”,
জলকেলিতে মাততো বক-সারস আর পানকৌড়ির দল।
সেসব এখন শুধুই স্মৃতির অবর্জনা।
এইতো সেদিনও-
তোমার মনবাগে নাম নাজানা কত রঙ-বেরঙয়ের ফুল ফুটতো
সুবাসে বুদ হয়ে যেত চারপাশ।
অথচ এই যে ভরাফাগুনেও শিমুল,পলাশের দেখা নেই আগের মতো ।
হয়তো সেকারণেই দোয়েল-কোয়েল,ময়না-শ্যামা নিরুদ্দেশ।
তোমার কী দোষ বলো?
যতো দোষ আমারই
মানে, আমার মতো শঠ, লম্পট, চরিত্রহীন, বেহায়া প্রেমিকদের।
যারা তোমার রূপ-যৌবনের বারোটা বাজিয়েছে।
অসাধু ভণ্ডপ্রেমিক মৌমাছিরা তোমার মধু চুষে খেয়েছে শুধু।
লুটেছে ইজ্জত, করেছে বিরাট সর্বনাশ।
তোমার হৃদয়ভূমি আজ বড়ই মরুময়।

নির্বাসিত

আজ নির্বাসিত ঘুম, নির্বাসিত স্বপ্ন।
বেয়ারা হয়ে ঘুরে বেড়ায় শান্তির পায়রারা।
অসময়ের বন্যায় ভেসে গেছে দূরদেশে।
নিষ্কণ্টক আবাদিজমি, ফলদ বৃক্ষরাজি,
সবকিছু আজ দখলদারিত্বের পারাকাষ্টে বন্দি।
রাতজাগা ডাহুকের মতো বুকফাটা আর্তনাদ চলে নিরলে-নিভৃতে।
কেউ শোনে, কেউ শোনে না।
হয়তো শোনে রাতের মহাজন।
যাতনার আগুনে দগ্ধ, ভষ্ম আত্মা আর দিগ্বিজয়ী সপ্ন।
কলিজা পোড়ার গন্ধ আজ আকাশে-বাতাশে।
তবু নির্বিকার আকাশ-বাতাশের মালিক।
ফরিয়াদি মন আজ বড় অভিমানি।
অভিমানে আর দুঃখে ভেঙে পড়ার উপক্রম ধৈর্যের বিশাল বটবৃক্ষ।
তবু কলিজার ভিতরে মিটিমিটি নিয়নআলো জ্বলে
প্রেমময় এর মুখ ফিরে তাকানোর আশায়।
খানিক কৃপা পাওয়ার আশায়।

দৈববিড়ম্বনা

স্বপ্নহীন আরণ্যক মন পড়ে আছে অসহায়,
কান্না তার জীবনান্ত সঙ্গী চিরকাল নিরূপায়।
বেশুমার এ কষ্টের নাই সীমা নাই
দীঘল সে রাত্রিজুড়ে পুড়ে ছাই ছাই
রোজ ডাকে দেহপাত ধ্বনি তার পাই
দৈববিড়ম্বনা আমায় যে পরখ করে যতনে,
সে দুখে ঝরে নবমল্লিকা আমার আশু পতনে।

আরও দেখুন

কবি সুফিয়া কামাল সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

কবি সুফিয়া কামাল : সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

নারী জাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত। নারী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী। সমাজ ...

Leave a Reply