হোম » সংস্কৃতি » চলচ্চিত্র » চলচ্চিত্র আন্দোলনের ভাবনা-চিন্তা_শেখ আবুল কাসেম মিঠুন
চলচ্চিত্র আন্দোলনের ভাবনা-চিন্তা_শেখ আবুল কাসেম মিঠুন

চলচ্চিত্র আন্দোলনের ভাবনা-চিন্তা_শেখ আবুল কাসেম মিঠুন

১৬৪৬ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ‘অ্যাথানাসিউস্ কিরখের’ আবিষ্কার করেছিলেন ’ম্যাজিক লন্ঠন’। স্বচ্ছ একটা মাধ্যমের ওপর ছবি এঁকে সেটাকে লেন্সের ভিতর দিয়ে পর্দায় প্রতিফলিত করাই এই ছবি প্রদর্শনের আসল কায়দা। ক্যামেরা বা ফিল্ম আবিষ্কার করার আগে এভাবেই প্রজেক্টর মেশিনের আদি সংস্করণ শুরু হয়। এরপর সমগ্র ইউরোপ জুড়ে নানাভাবে গবেষণা হয়। সে ইতিহাসের অবতারণা এখানে অবান্তর। শেষাবধি ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর তারিখে ফরাসি দু’ভাই অগুস্ত লুমিয়ের (১৮৬২-১৯৫৪) এবং লুই লুমিয়ের (১৮৬৪-১৯৪৮) আর্কল্যাম্প প্রজেক্টর দিয়ে প্যারিসেই প্রথম নিজেদের তৈরি চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন। এরপর একে একে বৃটেন, রাশিয়া ও আমেরিকায় চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। এর প্রায় ছয় মাস পরে ১৮৯৬ সালের ১৭ মে মুম্বাইয়ের ওয়াটসন হোটেলে লুমিয়ের গ্র“পের উদ্যোগে উপমহাদেশে প্রথম চলচ্চিত্র দেখানো হয়। ১৮৯৬ সালে ১৪ জুলাই মুম্বাইয়ের নভেলটি থিয়েটারে নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখানো শুরু হয়।

এই হলো উপমহাদেশে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। চলচ্চিত্র আবিষ্কার এবং প্রদর্শনীর সময়টাতে উপমহাদেশে (সমগ্র বিশ্বেও) মুসলিম জনগোষ্ঠির অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। খ্রিষ্টান ও বর্ণবাদী ব্রাক্ষ্মণদের শাসন হিন্দুদের উপর খ্রিষ্টান শাসকের পক্ষপাতিত্ব এবং সর্বস্তরে শোষণ, বঞ্চনার মধ্য দিয়ে মুসলিম জাতিকে ধ্বংসের প্রায় শেষ সীমানায় পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। মুসলিম জাতি তখন আত্মরক্ষায় ব্যস্ত, আত্মসমৃদ্ধির দরজায় তার কোনোভাবে উঁকি দেবার সুযোগ ছিল না।

সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাদীক্ষা, উচ্চশিক্ষা এবং বিভিন্ন প্রকার গবেষণা থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠি সরে গিয়ে বিভিন্ন পীর সাহেবের খানকায় গিয়ে শিষ্যত্বের চাদরে আত্মগোপন করে। তখন যত পীর ততভাগে মুসলিম জনগোষ্ঠি বিভক্ত হয়ে পড়ে।

অথচ এই সময়টিতে উপমহাদেশের হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, শিখ এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠি তাদের বৈষয়িক এবং মানসিক সংস্কৃতির ব্যাপক উত্তরণ ঘটায়।

চলচ্চিত্র ১৯২৭ সাল অবধি ছিল নির্বাক। ১৯২৭ সাল থেকে চলচ্চিত্রে প্রথম শব্দ প্রয়োগ পদ্ধতির শুরু হয়। নতুন মাত্রা পেয়ে চলচ্চিত্র একক, বৃহত্তম বাণিজ্যিক বিনোদন মাধ্যম হিসেবে উপমহাদেশে ঠাঁই করে নেয় এবং দর্শকদের সামনে বিনোদনের বিপুল উপাদান নিয়ে প্রতি মৃহূর্তে হাজির হতে থাকে। বিভিন্ন রাজ্যের রাজা, রাজপুত্র এবং জমিদার শ্রেণী চলচ্চিত্র ব্যবসায় অর্থ লগ্নি করতে থাকে। তারা গড়ে তোলে স্টুডিও, ল্যাবরেটোরি, স্যুটিং স্পট। নতুন নতুন প্রেক্ষাগৃহ তৈরি হয় উপমহাদেশের প্রায় সব শহরে।

অন্যদিকে বিক্ষিপ্ত- দলছাড়া, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিষ্পেষিত অথচ প্রতিভাদীপ্ত মুসলিম সাহিত্যিক, কবি, গীতিকার, সুরস্রষ্টা, পরিচালক এবং অভিনয় শিল্পীরাও তাদের সমস্ত পান্ডিত্য, মেধা, প্রতিভা, চেষ্টা ও শ্রম দিয়ে অনৈসলামিক পন্থায় এবং শিরক ও জাহেলিয়তের চুড়ান্ত সব সৃজনশীলতার জোগান দিতে থাকে, সমৃদ্ধ করতে থাকে জাহেলিয়তের ধ্বজাধারী উপমহাদেশের একমাত্র বিনোদন মাধ্যম চলচ্চিত্র শিল্পকে। এক পর্যায়ে মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র জগত গড়ে ওঠে- এম, বশির মাহমুদ সাহিতœরতœ, রাজা মেহেদী আলী খাঁন, জানেসার আখতার, রফিক গজনবী, শাকিল বাদাউনি, নৌশাদ, ইসমাত চুগতাই, আনোয়ার কামাল পাশা, আখতার শিরানী, মেহবুব খান, কে আসিফ, খাজা আহম্মদ আব্বাস, কামাল আমরোহীদের মত মুসলিমদের অমুসলিমপন্থায় জ্ঞানের ব্যবহারে এবং সহযোগিতায়।

মুসলিম জনগোষ্ঠির প্রতিভাদীপ্ত কবি-সাহিত্যিকরা তাদের নিজস্ব জীবন বিধান তথা পবিত্র কোরআন, হাদিস, সুন্নাহ্ এবং তাদের আপন সংস্কৃতিকে পাশ কাটিয়ে জাহেলিয়ত এবং শিরকবাদকে সমৃদ্ধ করেছে। ভুলে গেছে জাতি হিসেবে তাদের শ্রেষ্ঠত্বকে।

অন্যদিকে পীর সাহেবরা একজনের মুরীদ হলে আর এক পীরের মুরীদ হওয়া জায়েজ নয় এই ফতোয়া জারী করে বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠিকে বিভক্ত করে বিভিন্ন পীরের দলে এবং তাদের খানকায় আবদ্ধ করে রেখেছে। এই ফাঁকে ওই সব মুসলিম কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা অসংগঠিত অবস্থায় তাদের প্রতিভা উজাড় করে দিয়ে শক্ত করেছে শিরক ও জাহেলিয়তের শিকড়। শিরি-ফরহাদ, লাইলী-মজনু, হাতেম-তাঈ, সোহরাব-রুস্তম-এর গায়ে শ্রীকৃষ্ণ-রাধার অবৈধ-অশ্লীল প্রেমের রঙ চড়িয়ে সে সব কাহিনীকে বিভিন্ন শাখায় বিচিত্র সব উপাদানে ভরপুর করে একের পর এক সব চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে, তৈরি হয়েছে সংগীত। যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ প্রেম উদ্বুদ্ধকরণে এবং অবৈধ যৌনচারে উৎসাহিতকরণে।

উক্ত দুটি মূল লক্ষ্যকে পুঁজি করে হাজার হাজার চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। লক্ষ লক্ষ গান তৈরি হয়েছে। যার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো অবৈধ প্রেম ও যৌনাচারে উৎসাহ প্রদান। সব চলচ্চিত্র ও সংগীত উৎসাহিত ও সমর্থন করেছে হিন্দু পৌরাণিক প্রেম-কাহিনীর মূল বিষয় অবৈধ প্রেম ও যৌনাচারকে।

সমগ্র মুসলিম জাতি তাদের মন-মস্তিষ্কে এবং চিন্তায়-চরিত্রে ঐ একই ভাবধারার প্রলেপ মেখে বিভ্রান্ত হয়েছে। এইভাবে মুসলিম তরুণদের ও প্রতিভাবানদের চিন্তা-চেতনা থেকে সৃজনশীলতা লুপ্ত হয়েছে। আর চলচ্চিত্র নামক আধুনিক বিজ্ঞানের অবদানকে এবং তার বাস্তবতাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে নিজেদের সাংস্কৃতিক বিকাশের অন্যতম সিংহদরজাটি চিরতরে তালাবদ্ধ করে রেখেছে।

এমতাবস্থায় একটা বিশাল মিথ্যার পাথর চাপা দেবার প্রচেষ্টা চলেছে যা আজও চলছে, তাহলো এই যে, ইসলাম মানুষের চিন্তার বিকাশ ঘটতে দেয় না বরং নানান বাধ্যবাধকতা আরোপ করে ইসলাম মুসলিম জাতির মননশীলতা, চিন্তা-ভাবনা এবং চেতনাকে সংকীর্ণ করে দিয়েছে। এই অপবাদ আরোপের আরো কারণ হলো- চলচ্চিত্রের সেই উৎকর্ষের যুগে, পৃথিবীর বেশ কিছু উন্নত দেশে চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক ব্যাপক আন্দোলন মাথা তুলে দাঁড়ালো এবং সফল হলো। কিন্তু সেখানে যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধারক বলে দাবি করে তারা অর্থাৎ মুসলিমরাই অনুপস্থিত। ***

চলচ্চিত্র যে রীতিতে চলে আসছিল সেই রীতি সমাজ বিধ্বংসী ছিল বলে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে ফ্রান্সেই। ১৯২৩ সালে সেই নির্বাক যুগে। আন্দোলনটি ১৯৩২ সাল অবধি চলে। এই আন্দোলনটির নাম ছিল “আভা গার্দ” আন্দোলন। এই আন্দোলনের দুটি দিক ছিল- এক. চলচ্চিত্রের প্রথাগত রীতি থেকে বেরিয়ে আসা। দুই.ফটোগ্রাফির  দৃষ্টিকোণে অভিনবত্ব সৃষ্টি করা। অর্থাৎ যে ধরণের বিষয়বস্তু নিয়ে চলচ্চিত্রের কাহিনী তৈরি করা হয় তাকে বদলে দিয়ে সমাজ হিতৈষী বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করা এবং সঙ্গত কারণেই তখন ক্যামেরার ফ্রেমিং-কম্পোজিশান পরিবর্তন করা দরকার, সেটা করা। আর আসলেই এতে চলচ্চিত্রে নতুন বিষয় ও ভাবধারার সৃষ্টি হলো। ১৯৩২ সালের পর চলচ্চিত্রে আরো পরিবর্তন সূচিত করার জন্য “নিও-রিয়ালিজম”-এর উদ্ভব হয়। এই আন্দোলনকারীদের শ্লোগান ছিল, “ঞধশব ঃযব পধসবৎধ ড়ঁঃ রহঃড় ঃযব ংঃৎববঃং.” এদের মূল উদ্দেশ্য ছিল কট্টর বাস্তবতাকে সেলুলয়েডে তুলে ধরা। মানুষের প্রাত্যহিক উত্থান-পতন, মানবিক মূল্যবোধ, মানুষের চেতনার জাগ্রত প্রকাশ ইত্যাদি।

এরপর বৃটেনে একটা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। “ফ্রি সিনেমা”। তাদের বক্তব্য ছিল, ‘আমাদের পারিপার্শিক জগৎ ও জীবনের বস্তুপুঞ্জের অবিকল অনঢ় প্রতিচ্ছবিটাই বড় কথা নয়, তাকে কেন্দ্র করে নিজেদের প্রয়োজন মতো জীবনের সত্য খুঁজে বের করতে হবে। ১৯৫৬ সালে এই ‘ফ্রি সিনেমা’ আন্দোলন শুরু হয়। ততদিনে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান নামের মুসলিম দেশ স্বাধীন হয়েছে। এরও আগে সাদাকালো ছবিতে রঙের ব্যবহার শুরু হয়েছে। ১৯৫০-এ চওড়া পর্দার (ডরফব ংপৎববহ) আবির্ভাব হয়।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, পাকিস্তান আমলে প্রচলিত রীতির বাইরে ইসলামী সংস্কৃতি সমৃদ্ধ অথবা বিকল্পধারার চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক কোন আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠা তো দূরের কথা কোনো আন্দোলনের সূচনাও হয়নি। যদিও ১৯২৩ সাল থেকে যেসব আন্দোলন ইউরোপে গড়ে ওঠে তার ফলশ্র“তিতে বিশ্ববিখ্যাত সব নতুন ধারার চলচ্চিত্র, পরিচালক এবং নতুন টেকনিক বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করে।

চল্লিশ দশকের শেষে ফ্রান্সে ‘অথর থিওরী’র যুগ শুরু হয়। এদের বক্তব্য ছিল, ‘ঔপন্যাসিক, কবি, গল্পকার, নাট্যকারের মতোই চলচ্চিত্র পরিচালকেরও নিজস্ব বলার কিছু ব্যাপার আছে। এই ‘অথার থিওরী’ পরবর্তীতে বিখ্যাত সব পরিচালক ও চলচ্চিত্রের জন্ম দিয়েছে।

এরপর ১৯৫৮-৫৯-এ ‘নুভেল ভাগ্’ আন্দোলন শুরু হয় ফ্রান্সেই। পাঁচজন পরিচালকের সমন্বয়ে গঠিত একটা গোষ্ঠি এই আন্দোলনের সূচনা করেন এবং নেতৃত্ব দেন। ‘নুভেল ভাগ্’ আন্দোলন ফরাসী চরচ্চিত্রকে পরিবর্তন করে দেয়। বিশ্ববিখ্যাত অনেক পরিচালক এবং চলচ্চিত্র তৈরি হয ঐ সময়ে। এইভাবে যুগে যুগে বিভিন্ন আন্দোলনের ফলে সূচিত পরিবর্তন চলচ্চিত্রকে একটা বিশেষ পর্যায়ে উপনীত করেছে।

উপমহাদেশের চলচ্চিত্র, আমাদের দেশজ চলচ্চিত্র এবং হংকং, হলিউডের উদোম চলচ্চিত্র দেখে বোঝার উপায় থাকে না যে চলচ্চিত্রও মানবিক হয়ে উঠতে পারে, সর্বজনীন এবং কল্যাণকর হয়ে উঠতে পারে।

উল্লেখিত আন্দোলনগুলির অবতারণার কারণ এই যে, উপমহাদেশে যেসব চলচ্চিত্র তৈরি হয় এবং সরকারি অনুমোদনে যেসব চলচ্চিত্র আমদানী করা হয়- তার সমস্ত অবয়ব জুড়ে থাকে হিংস্রতা, বিবাহ বহির্ভূত অশ্লীল প্রেম এবং অবৈধ যৌনাচার। বিশেষ করে যে বয়সটাতে সৃজনশীলতার ঝোঁক আসে, চিন্তার ব্যাপকতা আসে এবং চিন্তার বিকাশের একটা প্রবণতা জন্মায়, ঠিক সেই সময়টার সামনে বিচিত্র উপাদান, নানান সুর ও ছন্দের এবং নানান রঙের যে মিশ্রণ চলচ্চিত্রে দেয়া হয় তার বক্তব্য মাত্র একটাই, “ অস্বাস্থ্যকর অনৈতিক আনন্দ”। এত লিপ্ত করিয়ে তরুণশ্রেণীর মানসিক বৈকল্য ঘটিয়ে তাদেও চিন্তা-চেতনা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করা হয়। বিপরীত দিকে ইসলামী সংস্কৃতির যে ব্যাপকতা, বিশালত্ব, তার সাহিত্য, সংগীত, কাব্য এবং পবিত্র কোরআন ও হাদিস ভান্ডারে যে চিন্তার মহাসমুদ্র উপস্থিত তা থেকে ভুল বুঝিয়ে, অজ্ঞ রেখে, সংকীর্ণতার অপবাদ দিয়ে সমগ্র মুসলিম তরুণদের মন-মস্তিস্ক থেকে মহান আল্লাহপাক ঘোষিত ‘শ্রেষ্ঠ জাতি’- এই তত্ত্বটার বিলুপ্তি ঘটানো হয়েছে এবং আজো নানা প্রকার মাধ্যমে বিলুপ্তি ঘটানোর চেষ্টা চলছে। তাই সিনেমায় এই একশ বছর পরেও সিনেমাকে ইসলামী সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ করার কোনো প্রবণতা এবং আন্দোলনের সূচনা হয়নি। আর তাই বিজ্ঞানের এই কল্যাণময় আবিষ্কারকে মুসলিম প্রতিভার বিশাল একটা অংশ জাহেলিয়তের সেবায় উৎসর্গ করেছে। ইসলামী কোনো জ্ঞান ছাড়াই মুসলিম নামধারীরা এই মাধ্যমটিকে ব্যবহার করেছে এবং করছে অমুসলিমদের অকল্যাণকর গতিধারায়। মাধ্যমটিকে মুসলিম জাতি এবং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে ব্যবহার করার অবদান এবং সাক্ষর রাখতে পারেনি। বরং দারুনভাবে অবজ্ঞায় অবহেলায় এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

চলচ্চিত্রিক ক্ষেত্রে মুসলিমরা তাদের আদর্শ, তাদের চিন্তা-চেতনা, আচার-ব্যবহারের প্রকাশভঙ্গি অমুসলিমদের মত হয়ে গেছে, মুসলিম-অমুসলিম পার্থক্য নেই বললেই চলে। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ মুসলিমরা তাই আজ ‘মুসলিম’ শব্দটাকে বাঁকা চোখে দেখে এবং সর্বজনীন নৈতিকতাকে ডিঙিয়ে অমুসলিমদের মতো অমানবিক, স্বার্থপর, মিথ্যাশ্রায়ী ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যায়। তাদের দৃষ্টিতে একজন মুসলিম হবে দরিদ্র, তার বিশেষ পোশাক থাকবে, সে ইঞ্জিনিয়ার হবে না, নেতা হবে না, বিচারক, গবেষক, ডাক্তার কিছুই হবে না, হওয়া সম্ভবও নয়, কারণ তার ধর্ম তার জীবন ও চিন্তা-ভাবনাকে মসজিদ ও মাদ্রাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে বলেছে। বিয়ে পড়ানো, আরবী শেখানো, মিলাদ পড়ানো এবং মৃতের জানাজা পড়ানোই তার কাজ।

যদিও ইসলাম সম্পর্কে এই সংকীর্ণ, ভুল, মিথ্যে এবং জঘন্য ইমেজ চলচ্চিত্রের সৃষ্ট নয় বরং চলচ্চিত্র মুসলিমদেরকে এমন রূপেই চিত্রায়িত করে। যা জাহেলিয়তের চিন্তাকে সমর্থন এবং শক্তিশালী করে। কিন্তু মুসলিমদের এই ইমেজ সৃষ্টির জন্য দায়ী কে! এক কথায় এর উত্তর- প্রতিষ্ঠিত মুসলিম নামধারী শাসকরা এবং তাদের শাসকসত্ত্বাকে দীর্ঘস্থায়ী করে থাকে তথাকথিত পীরদের খানকা ও তথাকথিত মাদরাসা শিক্ষা। এদের শিক্ষা হচ্ছে ইসলামের সর্বজনীন আইনগত পন্থা পালনে আত্মিক উন্নয়নকে বাতিল করে সীমাবদ্ধ কিছু মৌখিক কর্মপন্থায় আত্মিক অনুশীলন। অর্থাৎ ধুলা-বালি, ময়লা পরিস্কারকে প্রাধান্য দেয়া, কিন্তু ওসবের উৎসমূল চিরতরে ধ্বংস করার পথে তারা ধাবিত হয়না। এই কারণে মুসলিম নামধারী ইসলাম বিরোধী শাসকশ্রেণী পীর সাহেব ও সেইসব মাদরাসা শিক্ষিতদেরকে হাতিয়ার করে মনের মত করে ধূলা-বালি ও ময়লা উৎপাদনে অর্থাৎ ইসলাম বিরোধী বিধান ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় সর্বশক্তি নিয়োগ করার সুযোগ পায়। আর চলচ্চিত্র এই ভাবধারা ও ইমেজকে সমর্থন করে এবং পুষ্ট করে। কায়েমী স্বার্থপুজারী শাসকশ্রেণী তাই ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধেও সর্বশক্তি নিয়োগ করে থাকে। চলচ্চিত্রের সর্বাঙ্গে মন¯া—ত্বিকভাবে উক্ত বিষয়গুলো নানাপ্রকার মাল-মশলা দিয়ে সাজানো থাকে। সাধারণ মানুষের মনে তা গেঁথে যায় এবং তারাও ঐ একই পথে পরিচালিত হয়, তাদের কাছে ইসলামী বিধান কঠিন মনে হয়। আর এখানেই চলচ্চিত্রের বিপুল ক্ষমতা। অথচ সবারই জানা যে, বিধানকে যথাযথ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই আদর্শ প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায় জুলুমকে সমূলে উৎপাটন সম্ভব হয়ে ওঠে। আর রাস্তায় হাটলে ধুলো-ময়লা পরিস্কার করা যেমন সহজ হয় তেমনি তা সাহসও সঞ্চার করে, না হেঁটে শুধু মনে জিকির করলে সারা জীবনেও বিধানের রাস্তায় হাঁটার সাহস সঞ্চয় হবে না। শেখ শাদী র: যথার্থই বলেছেন,‘যে তরবারী দিয়ে ঘাষ কাটে সে জীবনেও যুদ্ধ করার সাহসী হয় না’। বাস্তবক্ষেত্রেও এটা প্রতীয়মান যে, আমাদের দেশে লক্ষ-কোটি মানুষ তবলীগের বয়ানে বা আখেরী মোনাজাতে অংশ গ্রহণ করলেও আল্লাহর বিধানের বিরোধীতাকারীদের বিরুদ্ধে টু’শব্দ করার হিম্মত হারিয়ে ফেলেছে।

মনে রাখা দরকার চলচ্চিত্র মানুষের মনে নতুন কোনো প্রবৃত্তির সৃষ্টি করে না। চলচ্চিত্র দেখার পর কেউ মন পরিবর্তন করে না। এ পর্যন্ত এমন হয়নি যে চলচ্চিত্র দেখে একজন অহিন্দু হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেছে। অথবা একজন মুসলমান খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। বা একজন পুজীবাদী কমুনিষ্ট হয়েছে। আমাদেরকে ভালো করে বুঝে নিতে হবে যে, চলচ্চিত্র নিজে কোনো সংস্কৃতি তৈরি করে না। তাহলে চলচ্চিত্রের কাজ কি! চলচ্চিত্রের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ হলো, সে সংস্কৃতির জোগান দেয়। তার লক্ষ্য হলো সে দর্শকের মনের রাজ্যে প্রভাব তৈরি করে। সে মানুষের ধ্যান-ধারণাকে সমর্থন জোগায়, তার চিন্তাকে বলিষ্ঠ ও বলবান করে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংস্কারগুলিকে জোরদার করে তোলে। মহানবী স: যা বলেছেন তার অর্থ এরকম যে, ‘মানুষ তার স্বভাব ধর্মের উপর জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তীতে তার পিতামাতা বা পরিবেশ তাকে কুফরী পথে ঠেলে দেয।’ তা হলে দেখা যাচ্ছে মানুষের কুফরী চিন্তা-চেতনাকে চলচ্চিত্র শক্তিশালী করছে। অথচ মহানবী স: যে চিন্তা নিয়ে উক্ত কথা বলেছেন তা বাস্তবায়নের জন্য ইসলামের অনুসারীদের জন্য চলচ্চিত্র একটা বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। সব মানুষই আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসী হয়ে জন্মে। কিন্তু নানা মতবাদ, নানা সংস্কৃতি সেটা ঢেকে ফেলে, যার নাম কুফর। চলচ্চিত্রে উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ মনের নিভৃতে লুকিয়ে থাকা সেই একত্ববাদকে উসকে দেয়া এবং তাকে তাজা ও জীবন্ত করে তোলা। যাতে ‘কুফর’ নামক সেই ঢাকনী সরে যায়, মানুষ সঠিক জ্ঞান ফিরে পায় এবং বুঝতে পারে তাকে একদিন আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। মহানবী স: সেই শাশ্বত বাণী নিয়েই এসেছিলেন। অর্থাৎ তাওহীদ, আখেরাত ও রিসালাতের সত্যতা ঘোষণা করাই হবে চলচ্চিত্রের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। এর মানে এই নয় যে প্রতিটি চলচ্চিত্রে শুধু এই ঘোষণাই দিতে হবে। ’রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেললে তাতে সওয়াব হয়’। অর্থাৎ চলচ্চিত্রের ঘটনাপঞ্জিতে যা থাকবে তা হবে সবই মানব কল্যাণের জন্য। একটা চলচ্চিত্রে হয়তো কোথাও তাওহীদ, আখেরাত কিংবা রিসালাত সম্পর্কে কিছুই বলা হলো না, কিন্তু সমাজ ব্যবস্থার অসঙ্গতি, মানুষের অমানবিক আচরণ অথবা কোন মন্দ বিষয়ের প্রতিবাদও ইসলাম বলে গণ্য হতে পারে। কারণ ইসলামের সকল আদেশ-নিষেধই কল্যাণকর। শুধু শর্ত হলো সকল কাজই হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে, তাঁরই আদেশ-নিষেধের আওতাধীনে।

অতএব এখনই সময় ইসলমী শিক্ষায় শিক্ষিত প্রকৃত মুসলিম, প্রতিভাবান, আগ্রহী, মেধাবী ও পরিশ্রমী তরুণদের সংগঠিত করে চলচ্চিত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলা। উপমহাদেশের বাঙালী মুসলিমদের সৌভাগ্য আজ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পবিত্র কোরআনের তফসীর বিশ্ববিখ্যাত ‘তাফহীমুল কোরআন’, ‘জিলালীল কোরআন’, সিয়াহ সাত্তাহ’র হাদীসগ্রন্থাবলী, মুসলমানদের শৌর্যবীর্যের ইতিহাস, অমুসলিম ইতিহাসবীদদের অনুবাদকৃত মুসলমানদেরকে নিয়ে মিথ্যা ও বিকৃত ইতিহাসের প্রমাণিত গ্রন্থ ‘চেপে রাখা ইতিহাস’, ইতিহাসের ইতিহাস’, ছাড়াও ইসলামী সাহিত্য-সংস্কৃতির বিপুল সম্ভার এখন হাতের কাছে। ঈমান, ইসলাম, নামাজ-রোজা, যাকাত, হজ্জ্ব, জিহাদ, তৌহিদ, রিসালাত, অখেরাত, সমাজ-রাষ্ট্রগঠন, ইসলামী সংবিধান, বিচার-ব্যবস্থা, অর্থনীতি, মোট কথা জীবন ও আধুনিক পৃথিবীর সর্ব বিষয়ে ইসলামের জ্ঞান, আদর্শ ও নীতি-বিধান সম্বলিত বই-পুস্তক পড়ে ইসলামের সঠিক রূপরেখা জানবার ও বুঝবার সুযোগ বর্তমান। তদুপরি ইসলামী সংস্কৃতির মৌলিক গ্রন্থ ‘ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা’ চলচ্চিত্র আন্দোলনকারীদের নতুন পথের দিশা দিবে।

যতই পৃথিবী আধুনিক হচ্ছে ততই প্রমাণিত হচ্ছে ইসলাম ছাড়া পৃথিবীর অন্য সমস্ত মত ও পথ সংকীর্ণ, ভ্রান্ত এবং অমানবিক। ইসলাম বিরোধী সমস্ত মত ও পথের অঙ্গজুড়ে আত্মস্বার্থ, নিষ্ঠুরতা, আত্মরম্ভিতা, অবৈধ স্বার্থগত পশুসুলভ প্রেম এবং অবৈধ যৌনাচার ভোগ। ইসলাম বিরোধী সমস্ত জ্ঞান, তত্ত্ব এবং অর্জন মিশে যায় ঐ কলঙ্কিত অকল্যাণকর, মনুষ্যত্বহীন শিকড়ে। যার থেকে উৎপন্ন জাহেলিয়াতের গাছের ছায়ায় শীতলতা নেই, আছে অস্থির অমানবিক স্বার্থগত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।

এখন সময়ের তরঙ্গে নিত্য নতুনভাবে প্রমাণিত হচ্ছে একমাত্র ইসলামেই রয়েছে চিন্তারাজ্যের বিশাল ব্যাপকতা এবং চিন্তার সঠিক ও সর্বোত্তম বিকাশের মাধ্যমই ইসলাম। অথচ যে চলচ্চিত্র মনিুষের দৈনন্দিন আচরণের সুক্ষèাতিসুক্ষè বিষয়গুলি তুলে ধরে সেই বাস্তবতাকে মুসলমানেরা এতবছর ধরে অস্বীকার করে এসেছে। সেই সুযোগে প্রবল শক্তিমত্তা নিয়ে অগ্রগামী হয়েছে এমন সব চলচ্চিত্র যা ইসলামের আদর্শকে দুর্বল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক ভূমিকায় কাজ করে চলেছে। বর্তমানে ইরাণী চলচ্চিত্র বিশ্বকে তাক লাগিয়ে ইসলামী আদর্শকে সমুন্নত করার কাজে ব্রত।

যাই হোক এখনই প্রয়োজন চলচ্চিত্র শিক্ষার। সময় অনেক পার হয়ে গেছে। তাই প্রয়োজন চলচ্চিত্র আন্দোলনের। ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলিম তরুণরা যথার্থ সুষ্ঠু নিয়মের অধীনে চলচ্চিত্র-শিক্ষালাভ করতে পারলে একটা শক্ত  আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। সে আন্দোলন শুধু বাংলাদেশে নয়, উপমহাদেশে এবং সমস্ত পৃথিবীতে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে কল্যাণময় চিন্তার ব্যাপক বিকাশ ও প্রকাশ সম্ভব। জন্মলগ্ন থেকেই চলচ্চিত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। কিন্তু সেখানে মুসলিমরা অনুপস্থিত। কেন অনুপস্থিত তার নানান কারণ ছিল। এই প্রবন্ধের একপর্যায়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চলচ্চিত্র আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত রূপ তুলে ধরা হয়েছে। এবার উপমহাদেশে চলচ্চিত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে আলোকপাত করছি।

প্রথাগত ধারার বিপরীতে অর্থাৎ বিপরীত স্রোতে চলতে গেলে অবশ্যই মেধা, শ্রম এবং ইচ্ছাশক্তিকে পূর্ণরূপে প্রয়োগ করতে হবে। হতে হবে সাহসী। সঠিক পথে চলার জন্য সমষ্টিগতভাবে একটি আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে। শিল্পের আলোচনায় বেরিয়ে আসবে আমাদের কি করণীয় এবং পথের রূপরেখা কি।

তথাকথিত সেক্স, ভায়োলেন্স এবং অশ্লিল ছবির বিরুদ্ধে নতুন ধারার ছবি নির্মাণ এবং প্রদর্শনের জন্য ভারতে প্রথম চলচ্চিত্র সংসদ গঠিত হয় কলকাতায় ১৯৪৭ সালে। নাম ছিল,‘ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি’। প্রতিষ্ঠা করেন সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ দাশগুপ্ত প্রমূখ। আমাদের দেশে প্রথম চলচ্চিত্র সংসদ গড়ে ওঠে ১৯৬৩ সালে। সমাজ সচেতন কিছু তরুণ চলচ্চিত্র প্রেমীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই চলচ্চিত্র সংসদের নাম ছিল,‘পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি’। স্বাধীনতার পর এর নাম হয় ‘বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটি’।

চলচ্চিত্র আন্দোলনের জন্য প্রয়োজন সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধে উজ্জ্বীবিত কিছু বোদ্ধা চলচ্চিত্র কর্মীকে দলবদ্ধ হওয়া এবং একটি গোষ্ঠি গঠন করা। যেটা সংসদ হিসেবে পরিচিত। এধরণের কিছু তরুণ ১৯৬৯ সালে আর একটি চলচ্চিত্র সংসদ গড়ে তোলে যার নাম ‘ঢাকা সিনে ক্লাব’। এরপর বহু চলচ্চিত্র সংসদ গড়ে ওঠে বাংলাদেশে। এইসব চলচ্চিত্র সংসদ শিক্ষিত তরুণ শ্রেণীকে চলতি নিন্মরুচির চলচ্চিত্রের বিপরীতে বিকল্পধারার বক্তব্যধর্মী নান্দনিক চলচ্চিত্র দেখতে ও বুঝতে উৎসাহিত করে এবং সেই ধরণের মানসিকতা গঠনে ভূমিকা রাখে। এটা মূলত একরকম দাওয়াতী কার্যক্রম।

সংসদগুলোর কার্যক্রম ছিল, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বক্তব্যধর্মী ক্লাসিক চলচ্চিত্রগুলো সংগ্রহ করা, সেইসব চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে সমাজ সচেতন দর্শক গড়ে তোলা এবং সদস্যদেরকে চলচ্চিত্র নির্মাণ, চিত্রনাট্য লিখন পদ্ধতি এবং সংলাপ রচনা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তোলা। চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রবন্ধ এবং বিভিন্ন শিক্ষণীয় বিষয় সমৃদ্ধ ম্যাগাজিন প্রকাশ করা, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন মফ:স্বল শহরেও তারা তাদের শাখা সংগঠন তৈরি করে এবং মফ:স্বলের তরুণদেরকে তাদের ভাষায় সুস্থ চলচ্চিত্রের প্রতি উৎসাহিত করে তোলে। সেই প্রক্রিয়া আজো অব্যাহত। (প্রবন্ধ লেখক ছাত্রজীবনে এই ধরণের একটি সংসদের শিক্ষার্থী হয়ে সুস্থ চলচ্চিত্র বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন, যদিও বাস্তবের নির্মমতায় প্রচলিত ও প্রথাগত চলচ্চিত্রের সঙ্গে তিনি যুক্ত হয়ে পড়েন।)

চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা করে আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজ সচেতন চলচ্চিত্রকর্মীরা যে অগ্রগতি সাধন করেছে তার ফলশ্র“তিতে বাংলাদেশে তারাই স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণ এবং পরবর্তীতে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি, প্রচারধর্মী, বিজ্ঞাপন-চিত্র, তথ্যচিত্র নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেরও আয়োজন করেছে এবং করছে। চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীদের দাবির মুখে বাংলাদেশ সরকার ‘ফিল্ম আর্কাইভ’ গঠন করে। তাদেরই অনুরোধে পুণা ফিল্ম ইনষ্টিটিউটের অধ্যাপক সতীশ বাহাদুর এই প্রতিষ্ঠানের রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন। সেখানে অনিয়মিত হলেও ফিল্ম বিষয়ে প্রশিক্ষণের কাজও হয়েছে।

এসবের বিপরীতে বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ তাদের অনুসারী তরুণদের সমাজ সচেনতার পাশাপাশি চলচ্চিত্র বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যাপারে উৎসাহিত না করে বা কোনো সুযোগ সৃষ্টি না করে তাদেরকে প্রতিক্রিয়া দেখানোতে পারদর্শী করে তুলেছেন। এতে সেইসব তরুণদের সৃজনশীলতার উৎসমূখ যেমন মরে গেছে তেমনি তারা পরিশ্রম বিমুখ হয়ে পড়েছে। প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য যেখানে অনুচ্চ কণ্ঠে একটু প্রতিবাদই যথেষ্ট সেখানে সৃজনশীলতার দাবি মিটাতে কঠিন পরিশ্রম কে করতে চায়!

১৯৬৮ সালে মার্কসবাদী কমিউনিষ্ট সত্যেন সেন প্রতিষ্ঠা করেন, ‘উদীচী শিল্পী গোষ্ঠি’। সেই সময়ের বিভিন্ন শিল্পি,  সাংস্কৃতিক গোষ্ঠি ও চলচ্চিত্র সংসদ কমিউনিজমের ভাবধারায় পরিচালিত হয়। বেশির ভাগই ছিল সক্রিয় কমিউনিষ্ট নতুবা কমিউনিষ্ট মতবাদে তাড়িত। ‘উদীচী’ ছিল তাদের সকল কর্মকান্ডের মূল প্রেরণা। পরবর্তীতে এদের কেউ কেউ বিদেশের ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে ফিল্ম বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসে। বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন চিত্র, টিভি, রেডিও, পত্র-পত্রিকার সাহিত্য-সংস্কৃতির পাতা এবং বিকল্পধারার চলচ্চিত্র নির্মানের ক্ষেত্রকে এরা দখল করে রাখে। আজো অধিকাংশ ক্ষেত্রে উক্ত কমিউনিজম ভাবধারার ব্যক্তিবর্গ তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তারা নামে মুসলিম হলেও ইসলাম তাদের কাছে অজানা। বরং মার্কস, এঙ্গেলস্, লেনিন, ডারউইন তারা যেভাবে আত্মস্ত করেছে, চর্চা করেছে এবং মন-মস্তিস্কে গেঁথে নিয়েছে সেভাবে তারা কখনো কোরআন পড়েনি, রাসূল স:-এর কর্মজীবন পড়েনি বা পড়তে চেষ্টাও করেনি। কমিউনিজম এবং ডারউইনবাদ প্রত্যাখ্যাত হলেও বাংলাদেশের কমিউনিষ্টরা এখনো সেই ব্যর্থ মতবাদে অটল। করণ এই হতে পারে যে, মানুষের সৃজনশীলতা অদম্য, অটল। তা যখন বন্যার পানির মত বাঁধ ভেঙ্গে প্রবাহিত হয় তখন পিছন দিকে তার আর সাড় থাকে না। যতক্ষণ না সে সব কিছু ডুবিয়ে ছাড়ে।

মুসলিম নেতৃবর্গ প্রতিভাধর মেধাবী সৃজনশীলদের কোন পথ করে দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ইসলামী নাটক, চলচ্চিত্র বা সামগ্রীক অর্থে সংস্কৃতির বিকাশ সাধিত হয়নি। ইজতিহাদ বা কিয়াসের মাধ্যমে পবিত্র কোরআন পাঠ শিখানো বা ইমামতি করাটাকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দাওয়াতী কাজকে পেশা হিসেবে নেয়াটার বিষয়ে কোন উৎসাহী নির্দেশনা পাওয়া যায়নি বরং পেশাগতভাবে গ্রহণে হতাশ করা হয়।

এদিকে বামধারার সাংস্কৃতিক কর্মীরা যখন নাটক বা চলচ্চিত্র তৈরি করছে তখন তারা তাদের চলচ্চিত্রে কোথাও কোথাও ইসলামকে এমনভাবে পেশ করছে যা আদৌ ইসলাম নয় বা কোথাও কোথাও জেনে বুঝে হেয় করছে এবং অপমান করছে। তাদের নাটক চলচ্চিত্রে মার্কসীয় ভাবধারা ও আদর্শ প্রকট যা সহজ-সরল মুসলিম তরুণদেরকে মানসিক বিভ্রান্তিতে সহসা লিপ্ত করতে পারে। ওদের মানসিক চিন্তাগত ভিত তৈরি হয়েছে অনৈসলামীকতার উপর। পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও জাহেলিয়াতের রসে সিক্ত এবং জাহেলিযাতের স্পর্শে পালিত ও লালিত হয়েছে এবং হচ্ছে। তাই তাদের নির্মিত বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাদের আদর্শের প্রকাশ নির্ভেজাল জাহেলিয়াত এবং কোথাও কোথাও বা মুশরিকি ভাবধারায় উজ্জীবিত।

যেহেতু আমাদের দেশে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলচ্চিত্র শিক্ষা দেয়া হয় না, তাই যারা হাতে-কলমে চলচ্চিত্র শিখতে চান তারা চলচ্চিত্রের মূলধারা হোক অথবা বিকল্পধারা হোক তার পরিচালকের অধীনে থেকে চলচ্চিত্র শিখতে হয়। (সরকারী এবং ব্যক্তি উদ্যোগে অল্প দু’একটা চলচ্চিত্রশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্তমানে চলছে)। যাদের মানসিক ভিত্তি, নৈতিক ভিত্তি এবং যাদের কর্মজগতটাই সম্পূর্ণ নির্ভেজাল জাহেলিয়াত তাদের সঙ্গে শিক্ষানবিশি করার কোন প্রকার পরিবেশ পাবে না সম্পূর্ণ ইসলামী আদর্শের ঈমানীশক্তিতে বলিয়ান একজন তরুণ মুসলিম। বরং হয় সে পথভ্রষ্ট হবে নতুবা তিক্তবিরক্ত হয়ে প্রত্যাখ্যান করে চলে আসবে।

পূর্বে যেসব চলচ্চিত্র আন্দোলনের কথা আমি উল্লেখ করেছি, তাতে চলচ্চিত্র শিক্ষার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উপায় ছিল না। যদিও বর্তমানে বিভিন্ন দেশের স্কুল-কলেজে চলচ্চিত্রকে পাঠ্যক্রম করা হয়েছে।

ফ্রান্সে চল্লিশের দশকে চলচ্চিত্র শিক্ষার প্রচলন হয়। ১৯৫০-এ, দু’বছরের পাঠ্যক্রম চালু হয়। ইংল্যান্ডে ১৯৬০ সালে ৭০০ স্কুলে ফিল্ম ও টেলিভিশন শিক্ষা দেয়া হয়। সেখানে চলচ্চিত্র শিক্ষকদের সমিতিও আছে।

আমেরিকায় ক্লাস প্রোজেক্ট হিসেবে ক্লাস সেভেনেই সিনেমা তৈরি করার কাজ শুরু হয়। বর্তমানে আমেরিকায় প্রায় ৫০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলচ্চিত্র শিক্ষা বিষয়ে ডিগ্রি গ্রহণের ব্যবস্থা আছে। ইংল্যান্ডে অনুরূপ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১০০। সংস্কৃতির সকল দিকই সন্নিবেশিত হয় ফিল্মে আর ফিল্ম তাই ব্যাপক শক্তিশালী মাধ্যম। ফিল্ম সংস্কৃতিকে পুষ্ট করে, বলিয়ান করে এবং সর্বোতভাবে সমর্থন জোগায়।

যেহেতু ফিল্ম একটি মাধ্যম- গণমাধ্যম, তাই গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি সম্পর্কে তরুণদের সম্যক ধারণা না থাকলে ফিল্মের বৈশিষ্ট্যগুলি উপলব্ধি করা তরুণদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এর জন্য যে সমাজে তরুণরা বাস করে তার কাঠামো, তার প্রকৃতি, তার চরিত্র সম্পর্কে তরুণদের সন্ধানী প্রশ্ন উত্থাপন করা দরকার। তার উত্তর পাওয়াও জরুরী। অতএব দেখা যাচ্ছে কোনো কার্যকরী চলচ্চিত্র শিক্ষা প্রকল্প এবং তাতে সক্রিয় হওয়ার অর্থ হলো তরুণদের সামাজিক জীবনে দায়িত্বশীল প্রবেশের একটা মহান উদ্যোগের অংশবিশেষ।

যাদের মানসিক ভিত্তি ঈমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত, কোরআন, হাদীস, ফিকাহ্ শাস্ত্র এবং অন্যান্য ইসলামী সাহিত্য চর্চায় যারা নিবিষ্ট তারাই কেবল চলচ্চিত্র শিক্ষার উপযুক্ত। তাদেরকে প্রথমেই এই সবক নিয়ে আত্মস্ত করা দরকার যে, পৃথিবীর সব মানবিক কল্যাণকে অবজ্ঞা করে শুধু নিজেদেরকে পূজনীয় করে তুলবার জন্য কোন লেখক, কবি, পরিচালক, শিল্পি চলচ্চিত্র শিক্ষা করবে না। নিজেদেরকে পূজা পাবার উপযোগী করে তুলবার জন্য সর্বজনীন মানবিক কল্যাণকে তারা ছুঁড়ে ফেলবে না। ইসলাম যে মানব কল্যাণের দিশা দিয়েছে সেই নীতি ও নৈতিকতার আদর্শকে প্রতিষ্ঠার জন্য তাদেরকে দায়িত্বশীল ও যতœবান হতে হবে। অর্থাৎ ব্যক্তিপূজা নয়, আদর্শ প্রতিষ্ঠাই হবে একজন চলচ্চিত্র শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীর মূল বিষয়।

চলচ্চিত্র শিক্ষার দুটি ধরণ আছে। ১. চলচ্চিত্র বিষয়ে শিক্ষা। ২. চলচ্চিত্রের কাছ থেকে শিক্ষা।

এই দুই ধরণের ব্যবস্থা করাই একটি চলচ্চিত্র সংগঠনের প্রাথমিক কাজ। একটি কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র শিবিরের অধীনে ছোট ছোট শিবির করে ইসলামী আদর্শের এবং ইসলামী আদর্শের নয় আবার ইসলামী নীতির বিরোধীও নয়, এমন সব ছবি প্রদর্শনী করে তা অনুশীলন করতে পারে। সাহিত্যের পাঠ যেমন ধ্র“পদী সাহিত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত তেমনি চলচ্চিত্রের পাঠক্রম মূলত ক্লাসিক ছবিগুলোকে কেন্দ্র করে। তাই এই ধরণের ক্লাসিক ছবি সংগ্রহ করে তা দেখা, শোনা, ভাবনা ও অনুভবের এক বিশেষ পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত হতে পারে। এবং পোর্টেবল প্রজেক্টরের মাধ্যমে জনসাধারণের সাথে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে পারে। এতে চলচ্চিত্রের শিক্ষার দুটি প্রাথমিক দিকই কার্যকরী করার সূচনা হতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলচ্চিত্র শিক্ষার এই পদ্ধতিই স্বীকৃত।

চলচ্চিত্র সমাজের স্বীকৃত ভাবনা ও মনোভাবকে প্রাধান্য দিয়েই তাকে বেগবান করে নতুবা বাধার সৃষ্টি করে কিন্তু সে দ্রুত কিছু পালটে দেবার ক্ষমতা রাখে না বরং যা গ্রহণযোগ্য ছিল না চলচ্চিত্র ধীরে ধীরে তাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষমতা রাখে। যেমন আমাদের মুসলিম সমাজে বহুকিছু গ্রহণযোগ্য ছিল না, যথা মেয়েদের হাতাকাটা ব্লাউজ, ওড়না বিহীন মহিলা অথবা আল্লাহ ছাড়া আর কারো নামে কসম খাওয়া, যুবক-যুবতীর প্রেমলীলা এরকম বহুকিছূ। চলচ্চিত্র এইসব বিষয়কে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। আবার এমন অনেক বিষয় আছে যা নিতান্তই ইসলামের মৌলিক বিষয় সেগুলোকে প্রচলনের ক্ষেত্রে বাঁধার সৃষ্টি করেছে। যেমন হাদিসের বাণীকে বাঁধাগ্রস্ত করে মনীষীদের বাণীর প্রচলন। নামাজ রোজা ছাড়াও ইসলামের বিভিন্ন বিধানকে চেপে বা ঢেকে রেখে (যাকে কুফর বলা হয়) মানব রচিত বিধানের জয়গান গাওয়া ইত্যাদি। অথচ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ইসলামের বিধি-বিধানের সর্বজনীন মানবীয় কল্যাণকে নিজেদের সমাজে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ছিল। তা না করে বরং মুসলিম চরিত্রের শেষ্ঠতম বিষয়গুলিকে বিকৃত করে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা হয়েছে। যা আজ ইরাণ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করছে।

তথাকথিত আধুনিকতা এবং আমেরিকা ইউরোপীয় সংস্কৃতি একটা নিরেট জাহেলিয়াতীয় মন-মস্তিস্ক তৈরি করতে সচেষ্ট এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সফলও। ইসলামী সংস্কৃতি ও জীবন-ব্যবস্থার আলোকে চিরন্তন মানবীয় অথবা চির আধুনিক ইসলামী মূল্যবোধকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ওইসব জাহেলিয়াতীয় মন-মস্তিস্কের অধিকারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব। যেমন সম্ভব হয়েছিল অতীতের মুসলিম শাসনের সময়।

অল্পবয়সীরা চলচ্চিত্র, টিভি, নাটক এবং বিজ্ঞাপনচিত্রের অভিনয় শিল্পিদের ও সংগীত শিল্পিদেরকে যে সব কারণে অনুকরণ করে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনুসরণের মানসিকতা গঠন করে, সে কারণগুলির অনুসন্ধান না করেও নির্দ্ধিধায় বলা যেতে পারে যে, সে সমস্ত অল্পবয়সীরা যেমন বিভ্রান্তিতে লিপ্ত হচ্ছে তেমনি ওইসব অভিনয় ও সংগীত শিল্পিরা নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ তথা নিজস্ব ব্যক্তি ইমেজ তৈরি করার ক্ষেত্রে অল্পবয়সীদের চিন্তা জগতে বিরুপ প্রভাব বিস্তার করে এমন কোন কিছুর তোয়াক্কা করে না। প্রকৃত অর্থে তারা ইসলাম তথা শান্তি বিরোধী সমাজ প্রতিষ্ঠা করে সেই সমাজে প্রতিষ্ঠা পাবার এবং অর্থ-সম্পদ অর্জনের কাজে লিপ্ত। আর তাই তারা শান্তিকামী সমাজ ও মানব কল্যাণের জন্য উপকারী নয়। ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারকারী কখনো সর্বজনীন মানবকল্যাণের জন্য উপকারী হতে পারে না। তাদের মাধ্যমে ধীরে ধীরে আমাদের সমাজে বিশেষ করে অল্পবয়সীদের মধ্যে জাহেলিয়াতের শিকড় বিস্তার হচ্ছে এবং সেটা ব্যাপক হচ্ছে দ্রুতগতিতে। তাদের কর্মপন্থার বিপরীতে যৌক্তিক এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে শুধুমাত্র মৌখিক বিরুদ্ধাচারণ করার ফলে তারা তাদের বিরোধীতাকারীদেরকে অসামাজিক, অসংস্কৃত, অনাধুনিক, প্রগতির অন্তরায়, সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ইত্যাদি বলে প্রকটভাবে শত্র“তা করে মুসলিম সমাজকে বহুধাবিভক্ত করে ফেলেছে।

অতএব ইসলামী দৃষ্টিতে চলচ্চিত্র শিক্ষার্থী এবং আন্দোলনকারীদের সদা-সর্বদা সতর্কতার সঙ্গে ব্যক্তি স্বার্থ না দেখে মানবতার স্বার্থকে ইসলামী আদর্শের পথে নির্ণয় করতে হবে এবং প্রাধান্য দিতে হবে।

চলচ্চিত্র শিক্ষার ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রথমে যা দরকার তা হলো উন্নতমানের ইসলামী ভাবধারায় পুষ্ট ছবিকে সহজলভ্য করা। যেমন দি ম্যাসেজ, ওমর মুখতার, বা ম্যাসেঞ্জার ইত্যাদি ছবি, অথবা ইসলামী ভাবধারার নয় কিন্তু ইসলাম বিরোধীও নয় এমন সব ছবি, যেমন অক্টোবর, হীরক রাজার দেশে, একদিন প্রতিদিন, বাইসাইকেল থিভ, চিলড্রেন হ্যাভেন বা ফাদার ইত্যাদি। এই সমস্ত ছবির প্রদর্শনী ও অনুশীলন দরকার।

প্রতিটি চলচ্চিত্র শিবিরকে এই দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে। এবং নির্মিত ছবিগুলির মান উন্নয়নে চলচ্চিত্র শিবিরের ভূমিকা থাকবে নেতৃস্থানীয়। কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র শিবির চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা, প্রচারপত্র, পুস্তিকা, ম্যাগাজিন প্রকাশ কওে জনসাধারণের মাঝে আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে। তারা বাৎসরিক ইসলামী চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করতে পারে, পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থাও করতে পারে। উন্নত ভিডিও ছবি তৈরির আনুসঙ্গিক টেকনোলজির ব্যবস্থা করতে পারে যাতে কম খরচে চলচ্চিত্র উৎপাদন ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়।

ভিডিও ক্যামেরা, প্রজেক্টর মেশিন, পর্দা, লাইট, ট্রলি, ক্রেন ইত্যাদির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এইভাবে একটা চলচ্চিত্র শিক্ষা এবং চলচ্চিত্র আন্দোলন সংগঠিত করা সম্ভব।

চলচ্চিত্র একটা বিরাট ও ব্যাপক গণমাধ্যম, সেহেতু রেডিও, পত্রিকা, বিজ্ঞাপন ও টিভি’র মতো চলচ্চিত্র শিক্ষা একটা মাধ্যম শিক্ষা। এগুলি সবই প্রযুক্তি নির্ভর। একদিকে নির্মাতা অন্যদিকে দর্শক, মাধ্যম হলো চলচ্চিত্র। অতএব মাধ্যম শিক্ষার যাবতীয় উপাদান ও উপকরণ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত। চলচ্চিত্র সব সময় সমাজের ভাষায় কথা বলে। কারণ এটি একটি মাধ্যম। উন্নত দেশে মাধ্যম বিষয়ে নতুন নতুন চিন্তাধারার উদ্ভব হয়। সেখানে মাধ্যম বিষয়ের শিক্ষা প্রাধান্য পায়। বর্তমান পৃথিবীতে ‘মাধ্যমের’ মাধ্যমে জনগণ তার মানসিক চাহিদা এবং প্রয়োজন পূরণ করে থাকে। আমেরিকায় মাধ্যমকে রূপ দেয় ভোগপণ্যবাদ। অর্থ ও সংযোগের মধ্যে এই মিলন সমাজ জীবনের প্রতিটি স্তরে নিষ্পন্ন হয় ক্লাস ঘরের মাধ্যম যন্ত্রের ব্যবহার থেকে বহুজাতিক সংস্থাগুলির সংযোগ উপগ্রহের সাহায্য গ্রহণ (টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন ধর্মী শিক্ষানুষ্ঠানের ব্যাপক প্রচার) পর্যন্ত।

বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে চলচ্চিত্রকে বিভিন্ন রূপে দেখা হয়। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে চলচ্চিত্র একটি পণ্যদ্রব্য, একটা ভোগ্যবস্তু, যা কোনো দেশের এক অন্যতম বৃহৎ ইন্ডাষ্ট্রির দ্বারা উৎপাদিত।

দর্শকের দৃষ্টিকোণ থেকে চলচ্চিত্র হলো আবেগময় অভিজ্ঞতা। একজন নির্মাতার দৃষ্টিতে চলচ্চিত্র একটি সৃষ্টি যা মানুষের চেতনাকে নাড়া দেয়। এইভাবে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে চলচ্চিত্রকে বিভিন্নভাবে দেখা যেতে পারে। তবে চলচ্চিত্র সব সময় শিল্প নয়, কিন্তু সব সময় তা একটি পণ্যদ্রব্য, একটা অভিজ্ঞতা, একটা পরিবেশ এটাও মনে রাখতে হবে।

তরুণ জীবনে চলচ্চিত্র একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। তাদের মন-মস্তিস্ক, চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতাকে চলচ্চিত্র হয় সমর্থন করে, শক্তিশালী করে এবং বেগবান করে নতুবা বাঁধাগ্রস্ত করে। তাই চলচ্চিত্রকে সেই সব বিষয়বস্তুর আঙ্গিকে শিক্ষালাভ করতে হবে যা ইসলাম সমর্থন করে। কারণ প্রমাণিত সত্য হিসেবে ইসলামই নৈতিকতার এবং জ্ঞান বিকাশের একমাত্র মানদন্ড।

চলচ্চিত্রকে অবজ্ঞা করা এবং উপেক্ষা করা মানে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা। পৃথিবীর বৃহত্তর আদর্শিক জনগোষ্ঠি হিসেবে মুসলমানদেরকে তাদেরই আদর্শিক পথে চলচ্চিত্রকে গতিশীল করা একান্ত প্রয়োজন। যাতে তাদের কল্যাণকামী চিন্তা-চিন্তন, সমাজ ও পৃথিবীর পথে তাদের মিশনের স্বরূপ এবং সর্বপরি তাদের আলোকময় অস্তিত্ব সম্পর্কে পৃথিবীর মানুষ অবহিত হতে পারে।

আরও দেখুন

আল-আকসা মসজিদে আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে_এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

আল-আকসা মসজিদে আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে_এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

আল-আকসা মসজিদকে কেন্দ্র করে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ফিলিস্তিন। মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র স্থান আল আকসা ...

Leave a Reply