হোম » সৃজন » গল্প » বুড়িগঙ্গায় জীবনতরী_ফারুক মোহাম্মদ ওমর
বুড়িগঙ্গায় জীবনতরী_ফারুক মোহাম্মদ ওমর

বুড়িগঙ্গায় জীবনতরী_ফারুক মোহাম্মদ ওমর

ইতিহাস-ঐতিহ্যের দিক দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদী কালের সাক্ষী হয়ে আছে। একসময় বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করেই গোড়াপত্তন হয়েছিল আজকের তিলোত্তমা শহর ঢাকার। আজো বুড়িগঙ্গা নদী জীবন্ত সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে হাজারো মানুষের কাছে। জীবনের জন্য বিভিন্ন উপাদান ও রসদ জুগিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন এই বুড়িগঙ্গা। বিষয়টি হয়তো আমরা কখনোই নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করি না। জীবন-জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গা নদীর বুক চিড়ে নৌকা দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পারাপার হচ্ছেন। আর যারা পারাপারে কান্ডারির ভূমিকা পালন করছেন তাদের জীবন-জীবিকার উৎস এই বুড়িগঙ্গাই। বিপন্ন অনেক মানুষের কাজের সন্ধান হয়েছে এই নদীকে ঘিরেই। অনেক গল্প রচিত হয়েছে বুড়িগঙ্গায় যারা নৌকা বেয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তাদের নিয়ে।

ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নদী পারাপারের জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত থাকেন মাঝিরা। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা ও বিকেল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত থাকে মানুষের প্রচন্ড চাপ। সরেজমিন দেখা গেছে, শুধু সদরঘাট এলাকা থেকে কামরাঙ্গীর চর পর্যন্ত কমপক্ষে দশটি ঘাটের মাধ্যমে পারাপার হয়ে থাকেন যাত্রীরা। ঘাটগুলো হচ্ছে- বাদামতলী, চম্পাতলী, পানঘাট, বাজরঘাট, বালুঘাট, মিটফোর্ড হাসপাতালঘাট, বাবুবাজারঘাট , সোয়ারিঘাট, হাসান মন্দিরঘাট, ডাবঘাট, ওয়াইজঘাট, সদরঘাট ও কামরাঙ্গীর চর ঘাট। একটি ঘাটে পারাপারের জন্য এক শ’ থেকে দেড় শ’ নৌকা থাকে।
একসময় এ ঘাট দিয়ে বড় গুদারা নৌকার মাধ্যমে যাত্রীরা পারাপার হতেন, কিন্তু কালক্রমে সেগুলো হারিয়ে গেছে। বর্তমানে ছোট ডিঙি নৌকায় পারাপার হচ্ছেন। তবে নৌকাগুলোতে এখনো যান্ত্রিকতার ছোঁয়া লাগেনি, অর্থাৎ বৈঠার মাধ্যমে চলছে এসব নৌকা। নৌকাগুলো ছোট হলেও সাধারণত সাত-আটজন যাত্রী একসাথে পারাপার হতে পারে সহজেই। মাঝি যখন পানিতে বৈঠা দিয়ে আঘাত করেন, তখন ছলাৎ ছলাৎ শব্দে একধরনের সুরের মূর্ছনা তৈরি হয়, যা এই বুড়িগঙ্গাতেই দেখা যায়। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় ও যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে জীবিকার তাগিদে নদীতেই কেটে যায় বেশির ভাগ সময়। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না সবই স্বপ্নের বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করে। কবে থেকে বুড়িগঙ্গায় পারাপার শুরু হয়েছিল তা জানা না গেলেও এতটুকু জানা গেছে, ঢাকা শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের সাথে সাথে পাশের বেশ কয়েকটি জেলার মানুষ এই নদী পার হয়ে রাজধানী ঢাকায় প্রবেশ করত। বর্তমানে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর বেশ কয়েকটি সেতু হওয়ায় অন্যান্য জেলার মানুষ যানবাহনে সেতু পারাপার হওয়ায় অনেকাংশে কমে গেছে নৌকার ব্যবহার। কিন্তু একদম ফুরিয়ে যায়নি নৌকায় পারাপারের মানুষের সংখ্যা। পাশের এলাকার মানুষ নৌকা পারাপারের মাধ্যমে রাজধানীতে প্রবেশ করে। আবার অনেকে শখের বশে বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ান ইচ্ছেমতো। কর্মরত মাঝিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সারা দিন কাজ করে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা আয় করেন। এর মধ্যে ঘাট আনুষঙ্গিক ২০০ টাকার মতো খরচ হয়ে যায়। ২২ বছর ধরে বুড়িগঙ্গা নদীর সোয়ারীঘাট থেকে জিঞ্জিরা পারাপারের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন আজিজুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। তিনি জানান, ২২ বছর আগে ভোলা থেকে কাজের সন্ধানে এসেছিলেন ঢাকায়। চাচাতো ভাইয়ের সুবাদে সোয়ারীঘাট এলাকায় পারাপারের কাজ জুটে যায়। সেই থেকে এখানেই কর্মরত রয়েছেন। ৫৫ বছর বয়সী আজিজুলের সংসারে রয়েছে বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও চার সন্তান। সোয়ারীঘাট সংলগ্ন এলাকায় পরিবার নিয়ে ভাড়াবাড়িতে থাকেন। যে আয় হয় তা দিয়ে ভালোভাবেই কেটে যাচ্ছে তাদের সংসার। জীবনের বাকি দিনগুলো এ পেশায়ই নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চান বলে জানান তিনি। কথা হয় ফরহাদ মাঝির সাথে। তিনি ১৮ বছর ধরে নদী পারাপারের সাথে যুক্ত রয়েছেন। তিনি জানান, যত দিন বুড়িগঙ্গা বেঁচে থাকবে, তত দিন বেঁচে থাকবে নৌকার মাঝিদের জীবন-জীবিকার স্বপ্ন। বুড়িগঙ্গা নদীতে যেসব মানুষজন নৌকা পারাপারের কাজে নিয়োজিত আছেন তাদের জীবন খুবই সাদাসিধে কিন্তু তাদের স্বপ্ন প্রজাপতির ডানার মতো রঙিন। প্রতিদিন কর্মব্যস্ত মানুষ যারা নৌকায় নদী পারাপার হয়ে থাকেন, তাদের হয়তো কেউই জানেন না নৌকার মাঝির সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার খবর। তারপরও বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে পেশাদারিত্ব টিকিয়ে চলেছেন যুগের পর যুগ।

আরও দেখুন

কবি সুফিয়া কামাল সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

কবি সুফিয়া কামাল : সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

নারী জাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত। নারী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী। সমাজ ...

Leave a Reply