হোম » গনমাধ্যম » সংবাদপত্র » সংবাদপত্রের গুরত্ব_অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান
সংবাদপত্রের গুরত্ব_অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান

সংবাদপত্রের গুরত্ব_অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান

আধুনিক যুগে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিদিন ভোরে বাড়ির দোরগোড়ায় হকার সেদিনের দৈনিক পত্রটি পৌঁছে দেন। নিদ্রা ভঙ্গের পর এক কাপ গরম চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার আগেই সেদিনের পত্রিকার জন্য মনপ্রাণ আনচান করতে থাকে। হাতে পাওয়া মাত্রই দু’চোখ ভরে পত্রিকার সর্বাঙ্গে দৃষ্টি বুলিয়ে সেদিনের বড় বড় খবরের হেডিংগুলো নজর বুলিয়ে তারপর খুটিয়ে খুটিয়ে একে একে সবগুলো খবর পড়ে এরপর প্রাত্যহিক কাজকর্ম শুরু হয়। এভাবে দৈনিক পত্রিকার প্রতি মানুষের আকর্ষণ দিন-দিন যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি পত্রিকার বিভিন্ন খবর মানুষের মনে নানাবিধ প্রতিক্রিয়ারও সৃষ্টি করে। এ প্রতিক্রিয়া কখনো আনন্দের শিহরণ সৃষ্টি করে, কখনো বেদনা ও হতাশার অনুভূতি জাগ্রত করে, কখনো কৌতূহল জাগ্রত করে, আবার কখনো জ্ঞানের নতুন দিগন্ত উšে§াচন করে। এভাবে একটি পত্রিকা আমাদের জীবনকে প্রতিদিন নানা বৈচিত্র্যময় আনন্দ-বেদনা-বিস্ময়-কৌতূহল ও জ্ঞানালোকে সমৃদ্ধ-সচেতন করে তোলে।
সারা বিশ্বে সংবাদপত্র আজ এক অতি শক্তিশালী মাধ্যম। সংবাদপত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর ক্ষুদ্র-বৃহৎ নানা খবর যেমন পরিবেশিত হয়, তেমনি দেশীয় ও বৈশ্বিক জনমতও এতে বিধৃত হয়। এটাকে সংবাদপত্রের দু’টি প্রধান দিক বা বিভাগ বলা যায়। একটি খবর পরিবেশন, দ্বিতীয়টি জনমত সৃষ্টি। নীতিগতভাবে এ উভয় ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষতা বজায় রাখার উপর গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন যেমন ঘটে, তেমনি এর ব্যতিক্রমও প্রায় সর্বক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয়। খবর পরিবেশন ও জনমত সৃষ্টি এ উভয় ক্ষেত্রেই অনেকেই প্রচন্ডভাবে নিরপেক্ষতার নীতি বিসর্জন দিয়ে থাকেন। কখনো ব্যক্তি স্বার্থে, কখনো জাতীয়, দলীয় বা গোষ্ঠী স্বার্থে, আবার কখনো রাজনৈতিক-কূটনৈতিক-অর্থনৈতিক ইত্যাদি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে নিরপেক্ষতাকে বিসর্জন দেয়া হয়। বিষয়টাকে একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
প্রতিটি সংবাদপত্রেরই মালিক পক্ষ সাধারণত কখনো ব্যক্তি স্বার্থে, কখনো নিজস্ব দলীয়, গোষ্ঠী বা আদর্শিক বিবেচনায় সংবাদপত্রের নিরপেক্ষ নীতি বিসর্জন দিয়ে থাকে। কোন মালিক যদি ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, পুঁজিপতি বা অর্থলোভী হয়, সেক্ষেত্রে তার অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থ সংরক্ষণ বা তা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে খবর ও বিভিন্ন ধরনের মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে পত্রিকাটি পক্ষপাতমূলক আচরণ করে থাকে। কোন মালিক যদি কোন রাজনৈতিক দলের অনুসারী বা আদর্শের অনুসারী হন, তাহলে সে পত্রিকাটি সাধারণত মালিকপক্ষের রাজনৈতিক ও আদর্শিক মতামতের অনুকূলে খবর ও জনমত প্রকাশের কৌশল অবলম্বন করে থাকে। অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের জাতীয় ও গোষ্ঠীগত স্বার্থের কারণেও সংবাদপত্রের নিরপেক্ষতা বিসর্জিত হয়ে থাকে। এ ধরনের বিভিন্ন ব্যক্তিগত, দলীয়, গোষ্ঠী বা জাতিগত স্বার্থ সংবাদপত্রের নিরপেক্ষতার প্রতি সর্বদাই হুমকি হিসাবে দেখা দেয়।
এক সময় জার্মানীর এক নায়ক রুডল্ফ হিটলার ঘোষণা করেন যে, পৃথিবীতে একমাত্র জার্মান জাতিই খাঁটি আর্যগোষ্ঠী এবং পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি। অন্য সব জাতিই নি¤œশ্রেণীর পর্যায়ভুক্ত। এ নীল রক্তের অহমিকা তার মধ্যে এমন গর্ব ও অহংকার সৃষ্টি করে যে, তিনি মনে করেন জার্মান জাতি পৃথিবীর সকল জাতিকে শাসন করার অধিকারী। তার এ উধ্যত অভিলাষ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তিনি জার্মানীর সামরিক বাহিনীকে বিশ্বজয়ী সামরিক শক্তিতে পরিণত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং একে একে পার্শ্ববর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইউরোপীয় রাষ্ট্র আক্রমণ করে সেগুলোকে জার্মান সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত করে নেন। এভাবে একদিন সারা বিশ্বে জার্মানীর আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তিনি রাশিয়া, ফ্রান্স, বৃটেন ইত্যাদি বড় বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো এক সঙ্গে আক্রমণ করে বসেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তার পরিণতি শুভ হয় নি এবং অবশেষে তিনি পরাজিত হয়ে আত্ম-গ্লানিতে দগ্ধ হয়ে আত্ম-হননের পথ বেছে নেন। এভাবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ স্বৈরাচারী শাসক, চরম অহংকারী ও নিষ্ঠুর সামরিক নেতার নির্মম জীবনাবসান ঘটে।
এ বিষয়টি উল্লেখ করার মূল উদ্দেশ্য হলো, একজন মানুষ কীভাবে এত বড় স্বৈরাচারী, অহংকারী, দাম্ভিক ও বিশ্বজয়ের অস্বাভাবিক আকাক্সক্ষার বশবর্তী হতে পারেন এবং এক ব্যক্তির জঘন্য অভিলাষ পূর্ণ করার জন্য সম্রগ জাতি কীভাবে তার পেছনে প্রত্যয়দীপ্ত হয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়! এর মূল কারণ ও পটভূমি আলোচনা করলে দেখা যায়, এক বলিষ্ঠ, কার্যকর, প্রচারযন্ত্র এর পেছনে সুপরিকল্পিতভাবে দীর্ঘদিন যাবৎ নিরলসভাবে কাজ করেছে। জার্মানীর তৎকালীন সংবাদপত্র ও সকল ধরনের প্রচারযন্ত্র হিটলারের উচ্চাভিলাস চরিতার্থ করার জন্য সাগ্রহে কাজ করেছে। সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রচারযন্ত্র সমানভাবে শানিয়ে নিয়ে হিটলার তার উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য কাজ করেছে। ফলে সমগ্র জার্মান জাতি এক অদম্য আবেগ নিয়ে হিটলারের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছে।
আধুনিক ইসরাইল রাষ্ট্রের দিকে আমরা যদি তাকাই তাহলে সেখানেও দেখা যায়, ক্ষুদ্র ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় থেকে আজ পর্যন্ত তার উন্নয়ন, অগ্রগতি ও অস্তিত্ব রক্ষার সকল ক্ষেত্রে সেদেশের সংবাদপত্র ও বিভিন্ন প্রচারযন্ত্রের এক বলিষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে। মূলত আত্ম-প্রতিষ্ঠা ও অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে তারা এমন এক আবেগ ও মানসিক প্রস্তুতি সৃষ্টি করেছে যে, কোনরূপ যুক্তি ও মানবিক বিবেচনাই তাদের জাতীয় নীতিতে স্থান পায় নি। ফলে পার্শ্ববর্তী আরব দেশসমূহকে তারা কোনরূপ তোয়াক্কা করে না, প্রতিদিন নৃশংসভাবে তারা প্রতিবেশী আরবদেরকে হত্যা করে চলেছে, তাদের পৈত্রিক বাস্তুভিটা থেকে তাদেরকে উৎখাত করছে, তাদের সকল স্থাপনা ভেঙ্গে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে। কখনো আবার সে বিধ্বস্ত জনপদের উপর গড়ে তুলছে হানাদারদের বসতি। বস্তুতান্ত্রিক উন্নতি, সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামরিক প্রস্তুতি ও বৃহৎ শক্তিবর্গের কূটনৈতিক সহযোগিতার চেয়েও এক্ষেত্রে ইসরাইলের এ মানসিক প্রস্তুতির মূল্য ও গুরুত্ব অনেক বেশী। আর এ প্রস্তুতি গ্রহণ, এর সংরক্ষণ ও সার্বক্ষণিকভাবে একে তৎপর রাখার মূলে সেদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র ও প্রচার মাধ্যমের ভূমিকাই সর্বাধিক।
বর্তমান বিশ্বের একক পরাশক্তি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকালেও আমরা একই অবস্থার প্রতিফলন লক্ষ্য করি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ তার দেশের অতি ক্ষমতাধর নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তিনি আমেরিকার মতো বিশাল দেশের নেতৃত্ব দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য সকল দেশে তার দেশের তথা আমেরিকার খরবদারী ও আধিপত্য বিস্তারে সদা তৎপর। তার শাসনামলে আমেরিকা অন্যান্য মিত্র-শক্তির সহায়তায় একে একে আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো দু’টি প্রাচীন সভ্যতার দেশকে নৃশংসভাবে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে। বিগত কয়েক বছর ধরে ঐ দু’টি দেশে আমেরিকার নেতৃত্বে অবলীলাক্রমে বর্বরোচিত আক্রমণ পরিচালিত হচ্ছে, অসংখ্য নিরীহ লোক প্রতিদিন সেখানে মৃত্যুবরণ করছে। প্রতিদিন ধ্বংস হচ্ছে সেখানকার জনপদ, জনপথ, বিভিন্ন অট্টালিকা, স্থাপনা, স্থাপত্য তথা সভ্যতার সকল নিদর্শন। মানবতা তথা বিশ্ব-শান্তির জন্য চরম বিপজ্জনক জর্জ বুশ সমগ্র বিশ্বে নিন্দিত হলেও স্বদেশে তার সমর্থন নেহায়েত কম নয়। এর পেছনে যে শক্তি বা কৌশল এককভাবে কাজ করছে তা হলো, ইহুদী- প্রভাবিত সেখানকার শক্তিশালী সংবাদপত্রসমূহ ও বিভিন্ন ধরনের প্রচার-মাধ্যম।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সোভিয়েত রাশিয়া, চীন, পূর্ব-ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকার দু’একটি দেশে সমাজতন্ত্রের যে অভ্যূদয় ঘটে, সে অভ্যূদয়ের কাল থেকে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, বিস্তার, প্রচার ও সংহত করার ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট প্রচারযন্ত্রের ভূমিকা ছিল অভূতপূর্ব। সে সময়কার প্রতিটি সমাজতান্ত্রিক দেশের প্রচারযন্ত্র ছিল সম্পূর্ণরূপে সরকার নিয়ন্ত্রিত। কমিউনিজমের কুফল নয়, তার ধ্বংসযজ্ঞ নয়, মানবতা-বিরোধী নির্দয় আচরণ নয়, কেবল তার কল্পিত সাফল্য ও ফাফানো জয়গাঁথা বর্ণনা করে কমিউনিজমের প্রচার-প্রসারকে ত্বরান্বিত করাই ছিল সেসব দেশের সংবাদপত্র ও প্রচারযন্ত্রের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ফলে লৌহ-যবনিকার অন্তরালে ঘটমান কোন কিছু সম্পর্কেই বহির্বিশ্ব অবগত হতে পারতো না। সমাজতন্ত্রের মতো একটি অসাড়, মানবতা ও গণতন্ত্র-বিরোধী আদর্শ দীর্ঘ সত্তর বছরকাল জগদ্দল পাথরের ন্যায় পৃথিবীর বুকে চেপে বসেছিল, তা একমাত্র এ বিশেষ সংবাদপত্র ও প্রচার-মাধ্যমের কারণেই।
আমাদের দেশের ইতিহাস, সামাজিক-রাজনৈতিক উত্থান-পতনের দৃশ্য পর্যালোচনা করলেও সংবাদপত্রের ভূমিকা ও গুরুত্ব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। সুদূর অতীতের পর্যালোচনা না করে শুধুমাত্র বিগত শতাব্দীতে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই তার যথার্থতা প্রমাণিত হবে। ১৯০৫ সনের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, ১৯০৬ সনে ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিম লীগের জš§, এরপর দেশব্যাপী স্বদেশী আন্দোলন, ১৯১১ সনে বঙ্গভঙ্গ রদ, ১৯১৯-২২ সনে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন, ১৯২১ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, ১৯৩৫ সনে ভারত শাসন আইন পাশ, ১৯৩৭ সনে প্রথম সাধারণ নির্বাচন ও শেরে বাংলা এ.কে.ফজলুল হকের নেতৃত্বে মন্ত্রী সভা গঠন, ১৯৪০ সনে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ গ্রহণ, ১৯৪৩ সনে ভয়াবহ মন্বতর, ১৯৪৬ সনে গণভোট অনুষ্ঠান, হিন্দু-মুসলিম ভয়াবহ দাঙ্গা ও ১৯৪৭ সনে স্বাধীন পাকিস্তান ও স্বাধীন ভারতের প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বড় বড় সব ঘটনার পেছনেই সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
ঐ সময় যেসব পত্রিকা ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলোÑ টাঙ্গাইলের ধনবাড়ির জমিদার নবাব আলী চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত ‘মোসেলম হিতৈষী’, রেয়াজ উদ্দীনের সম্পাদনায় ১৯০৫ সনে প্রকাশিত ‘সোলতান’ পত্রিকা, ১৯০৭ সনে প্রকাশিত ‘মোসলেম সুহৃদ’, ১৯১১ সনে প্রকাশিত মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত ‘মোহাম্মদী’, ১৯১২ সনে মোজাম্মেল হক ও আবদুল হাকিমের সম্পাদনায় পুনঃপ্রকাশিত ‘মোসলেম হিতৈষী’, বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ফারসি, বাংলা ও ইংরেজি যুগপৎ এ তিন ভাষায় প্রকাশিত ‘হাবলুল মাতীন’ (এর ফারসি সংস্করণের সম্পাদক ছিলেন মঈদুল ইসলাম, বাংলা সংস্করণের সম্পাদক মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও ইংরেজি সংস্করণের সম্পাদক আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দ্দী), ১৯২০ সনে শেরে বাংলা এ.কে.ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত ‘নবযুগ’ (এ পত্রিকার সম্পাদনার সাথে বিভিন্ন সময় জড়িত ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কমরেড মুজাফফর আহমদ, ফজলুল হক শেলবর্ষী, ওয়াজেদ আলী ও আবুল কাসেম), ১৯২১ সনে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত ‘দৈনিক সেবক’, ১৯২২ সনে ‘দৈনিক সেবক’ বন্ধ হওয়ার পর আকরম খাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘মোহাম্মদী’, কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত স্বল্পস্থায়ী ‘ধূমকেতু’, অতঃপর আকরম খাঁর পরিচালনায় ও আবুল কালাম শামসুদ্দীনের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘দৈনিক আজাদ’, ১৯২৬ সনে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পটভূমিতে ইংরেজি ‘দি মোসলমান’ পত্রিকার সম্পাদক মৌলভী মুজিবর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় ও আবুল মনসুর আহমদের সহযোগিতায় প্রকাশিত ‘দৈনিক খাদেম’, ১৯২৬ সনে মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সম্পাদনায় ‘দৈনিক ছোলতান’, কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় ‘লাঙল’, কমরেড মুজাফফল আহমদের সম্পাদনায় ‘গণবাণী’ এবং আবুল মনসুর আহমদের সম্পাদনায় ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ (এ পত্রিকার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন নবাব আলী চৌধুরীর পুত্র হাসান আলী চৌধুরী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দ্দী।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মুসলিম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন ও বাঙালি মুসলমানদের নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে উপরোক্ত বিভিন্ন সাময়িক ও দৈনিক পত্রিকার ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৪৭ সনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলা ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্ত শাসন আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যূত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যূদয় ইত্যাদি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে তখনকার সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সনে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বর্তমান কাল পর্যন্ত জাতি গঠন, অর্থনৈতিক-সামাজিক উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বৈরতন্ত্রের উচ্ছেদ এবং সর্বশেষে জাতীয় পর্যায়ের ব্যাপক দুর্নীতি, অরাজকতা ও বিশৃংখলা দূরীকরণে সংবাদপত্র সর্বদাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যা কেউ অস্বীকার করতে পারে না।
সংবাদপত্রের এ গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে সংবাদপত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে আরো বেশী দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলে সর্বদা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সক্ষম হন নি, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বিক জনকল্যাণের বিষয়কে তারা অনেকেই ব্যক্তিগত, দলীয় ও গোষ্ঠীগত স্বার্থের নিকট জলাঞ্জলী দিয়েছেন। এ নেতিবাচক আত্মহননের পথ থেকে সংবাদপত্র ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে, জনস্বার্থে ও জাতীয় স্বার্থে তাদেরকে সকল সংকীর্ণ স্বার্থ বিসর্জন দিতে হবে। সত্যকে সত্যরূপে এবং মিথ্যাকে মিথ্যারূপে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার সাহসী ভূমিকা তাদেরকে পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা শুধু কোন বিশেষ শ্রেণীর জন্য নয়, সকল শ্রেণীর মানুষের জন্যই তা সমভাবে প্রযোজ্য।

আরও দেখুন

কবি সুফিয়া কামাল সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

কবি সুফিয়া কামাল : সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

নারী জাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত। নারী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী। সমাজ ...

Leave a Reply