হোম » গনমাধ্যম » সংবাদ ও সংবাদের মানুষ প্রসঙ্গ : মফস্বলের সাংবাদিকতা_এস আর এ হান্নান
%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%a6-%e0%a6%93-%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%b7-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0

সংবাদ ও সংবাদের মানুষ প্রসঙ্গ : মফস্বলের সাংবাদিকতা_এস আর এ হান্নান

প্রয়াস, প্রত্যয়, প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়-মানুষকে মননশীল করে। মেধা ও মননের সৃজনে মানবের চিত্তলোক উর্বর হয়। প্রফুল্ল হয়। প্রস্ফুটিত হয়। প্রজ্বলিত হয়। সুপথে হাঁটতে শেখেন সুস্থধারার কার্যক্রমে আবদ্ধ মানুষগুলো; মানুষের জন্য ভাবেন। সমাজের জন্যও ভাবেন। অনন্ত অকৃপণতায় আলোর বিচ্ছুরণ ঘটান। হিতৈষিতায়-আলোকবর্তিকা জ্বালেন। প্রজন্মকে আলোকের পথে টানেন। অগ্রযাত্রার পথ দেখান। সংবাদ ও সংবাদের মানুষগুলো এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। মফস্বলের সাংবাদিকদের দায়িত্ব, কর্তব্য, ন্যায়নিষ্ঠতা ও দায়বদ্ধতার গুরুত্বও কম নয়। তবে দায়িত্বশীল অবস্থায় ও অবস্থানে থেকেও আমরা অনেকেই দায়বদ্ধতার ধার ধারছি না। পথভ্রষ্ট হচ্ছি। জবাবদিহিতা বেমালুম ভুলে গিয়ে হিংসা-দ্বেষে নিপতিত হয়ে কলুষ করে চলেছি মহান এই পেশাকে। অজ্ঞাত কারণে, জানা-অজানা, চেনা-অচেনার কাছে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ছি। ‘সৎ মায়ের হাতে শিশুর বলি’ এ খবর এড়িয়ে ‘গুল খেয়ে আত্মহত্যা’র খবর নিয়ে মাতামাতি করছি। বিচলিত হয়ে পড়ছি।
প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে সংবাদদাতা। এক্ষেত্রে স্থান, কাল, সময়, পাত্র, ক্ষেত্র ও পেশার ভিন্নতা থাকতে পারে। প্রত্যেকেই সংবাদদাতা হলেও, প্রত্যেকেই রিপোর্টার, সংবাদকর্মী বা সাংবাদিক নন। সংবাদদাতা, সংবাদকর্মী, সাংবাদিক ও রিপোর্টার শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রায় একই ধরনের।
মফস্বলের সাংবাদিকতায় যে বিষয়টি পুঞ্জিভূত- সেটি হলো হিংসা-দ্বেষ। কেউ কারো এগিয়ে যাওয়া, অর্জন, প্রাপ্তি ইত্যাদি ভালো চোখে দেখেন না। পরনিন্দা ও পরচর্চায় সোচ্চার হয়ে উঠেন। ঐক্যমতে ফাটল দেখা দেয়। সহাবস্থান বিচ্ছিন্ন হয়। ভাগে ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে জাতির বিবেক। ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়। সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এছাড়া, রাজনৈতিক রঙ ও আভায় সন্নিবেশিত হয়ে কেবল সাংবাদিকরাই নন, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও আইনজীবীসহ অনেকেই পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতা থেকে সরে পড়ছেন।
মফস্বলে এমনও অনেক সাংবাদিক আছেন যারা প্রত্যহ সকালে এজেন্সিতে খবরের কাগজ পৌঁছনের আগেই এসে উপস্থিত হয়ে যান। একের পর এক কাগজ উল্টোতে থাকেন। এজেন্সিতে যেসব পত্রিকা আসে, সেগুলো সাধারণত: আগের দিনের অথবা পুরোনো দিনের পত্রিকা দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় আসে। নতুন-পুরোন কাগজ ঘেঁটে যুৎসই পাতাটি বোগলে গুঁজে বেরিয়ে পড়েন। এরপর গোপনে বাড়িতে বসে অবিকল খবর লেখা শুরু করে দেন। হয়ে উঠেন বিরাট খবরের বিরাট সাংবাদিক। বিষয়বস্তু ঠিক রেখে শুধু স্থানের নাম বদলে দিয়েই ব্যস! বণে যান মহাসাংবাদিক। যেমন-মহাদেবপুরের স্থানে মহম্মদপুর অথবা বগুড়ার স্থলে মাগুরা। খবরের অন্যান্য বিষয়বস্তু হুবহুই থাকলো। পত্রিকায় খবর ছাপা হলেও বোগলে করে ঘোরেন। দেখান নানান মানুষকে। বাহবা কুড়ান। অনেকটা ঢোল পিটিয়ে প্রচারণার মতোই। এভাবেই নকলনবীস সাংবাদিকদের দৌরাত্ম ও হুড়োহুড়িতে প্রকৃত পরিশ্রমি সাংবাদিকরা নানান সময় নানান জায়গায় অপ্রস্তুত ও অপদস্থ হন। লজ্জা পান। ক্ষুব্ধ হন। এটা অনাকাক্সিক্ষত বাস্তবতা। বাহবা প্রত্যাশী নকলনবীস ও তিলকে তাল বানানো এসব সাংবাদিকদের অবাধ দৌরাত্ম ও বিচরণে বেকায়দায় পড়ছেন প্রকৃত-প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাংবাদিকরা। এটিই হচ্ছে মফস্বল সাংবাদিকতার নিরেট চিত্র।
যশোরের একটি অভিজাত হোটেলে সাংবাদিকদের দুই দিনের প্রশিক্ষণে এপি-বাংলাদেশের ব্যুরো চিফ ফরিদ হোসেন [প্রশিক্ষক] বলেছিলেন, অনুসরণ করা ভালো তবে অনুকরণ করা নয়। সুস্থ চর্চা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দক্ষতা-যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। এ জন্যে দরকার প্রত্যয়-প্রচেষ্টা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়। প্রকৃত শিক্ষার অভাব থাকলে ইতিবাচক চেতনার বিকাশ ঘটে না। এসব প্রকৃতির সাংবাদিকরা সর্বদা নেতিবাচক ভাবনার মধ্যে ডুবে থাকেন। এরা নৈমিত্তিক গন্ডিতে আবদ্ধ। বন্দিত্বের জাল ছিঁড়ে বেরুতে ব্যর্থ হন। শুভ ব্রত নিয়ে দীর্ঘ সাধনায় অনেক দূর পর্যন্ত এগুনো সম্ভব। কিন্তু সংকীর্ণতায় আচ্ছাদিতরা আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন এটাইতো স্বাভাবিক। বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে চর্চা করলে কোনো ক্ষেত্রেই সফলতা আসে না। এখানে দীর্ঘ সময় নিয়োগ ও মেধার প্রয়োগ নিহিত। নিয়ত বন্দিশালায় থেকে সপ্তাহের দুই/একদিন অন্যের বাহনে, অন্যের কাঁধে ভর করে কতোটা দূরইবা অতিক্রম করা যায়। প্রয়োজন স্বাধীনতা। পথ চলার স্বাধীনতা। সীমাবদ্ধতার পরিধি পেরোনোর স্বাধীনতা। লেখার স্বাধীনতা। নির্দিষ্ট ও ধরাবাঁধা সময়ের মধ্যে থেকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনো দুরুহ কঠিন।
কেউ ফুলটাইম সাংবাদিক। কেউ হাফটাইম, পার্টটাইম। সাংবাদিকতা পেশাটি অনেকটা লোহার ছুরি-কাটারির মতো। অবিরত যতœ নিলে, কাজ করলে দিনকে দিন ধারালো হয়ে হঠে। ঘষতে ঘষতে চকচকে হয়। যেনো নতুন প্রতিদিন। এটা মননে লালনের ব্যাপার। অন্যথায় ফাঁকফোঁকরে ও দায়সারাভাবে কাজটি করলে জংতো [মরিচা] ধরবেই। সাংবাদিকতায় যিনি যতোবেশি সময় দিতে পারেন, দৌড়ঝাপ করতে পারেন, সত্যানুসন্ধানে ঘটনার খুব কাছাকাছি যেতে পারেন এবং বাস্তব ঘটনার নিগুড় বর্ণনা দিতে সক্ষম হন- তিনি পেশায় সফল হন একই সাথে পাঠকের কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেন। অন্যকোনো পন্থা বা উপায়ে ব্যত্যয়তো ঘটবেই। সাংবাদিক হওয়াটা হয়তো অনেক সহজ কিন্তু দায়বদ্ধতা থেকে দায়িত্ব পালন করাটা অনেক কঠিন। কঠিন পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা।
দিনের পর দিন খবর ও খবরের ছবি ধার করতে করতে মফস্বলের অনেকেই এখনও সংবাদ লেখা শিখে উঠতে পারছেন না। যদিও কেউ কেউ সময়-সাপেক্ষ্যে একটু আধটু করে সময় ব্যয় করে সংবাদের মানুষ হয়ে উঠতে গিয়ে হরহামেশায় ভুল শব্দ চয়ন ও ভুল বানানে মুখর করেন প্রস্তুতকৃত খবর। এ ধরনের নেতিবাচক মনোভাবাপন্ন মানুষগুলো হয়ে উঠছেন জাতির বিবেক-মেরুদন্ড। ফলে পেশাদারিত্ব নিয়েও পাঠক প্রশ্ন তোলেন। কথায় বলে ‘নদীর পানি ঘোলাও ভালো, জাতের মেয়ে কালোও ভালো’।
মফস্বলের সাংবাদিকরা অনেকটা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো অবস্থা। তাই বলে অনাদর, অবহেলা আর অবজ্ঞাভরে মহৎ পেশাটিকে কলুষিত করা নৈতিকতা বিবর্জিত। অপরাধও বটে। এটা বিবেক ও মনুষ্যত্ব সম্পন্ন মানুষের কাম্য নয়-নিশ্চয়ই। রোদ-বৃষ্টি, শীত-কুয়াশাসহ বিভিন্ন বৈরিতা মাড়িয়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সংবাদের পেছনে ছুটে চলা সংবাদের মানুষটিও সাংবাদিক। আবার দিনের পর দিন, বছরের পর বছর অন্যের তৈরি করা খবর নিয়ে এবং কখনও-সখনও ফুল-ফলের ছবি তুলে ঘরে বসে লেখা সংবাদের মানুষটিও সাংবাদিক। দু’টোর মধ্যে যোজন যোজন ফারাক। এছাড়া বিষয় ভিত্তিক প্রশিক্ষণ না থাকার কারণে অনেকেই অজ্ঞতাবশত: সাংবাদিকতার নিয়ম-নীতির যথেচ্ছ ব্যবহার করছেন। তবুও তারা বুক উঁচিয়ে চলেন। অপরাধ ও অনুশোচনাবোধ তাদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে না একবিন্দুও। বাঘের চামড়া গায়ে পরলে বিড়াল কখনওই বাঘ হয়ে যায় না। নিজেকে বাঘ ভেবে হুঙ্কার ছেড়ে মানসিক হিংস্রতার বহিঃপ্রকাশ ঘটান। এটা বোকামির শামিল। স্টাডি না করলে মুখস্থ বুলি বেশিদিন আওড়ানো যায় না। চলতে, বলতে, শিখতে, জানতে এবং লিখতে হলে পড়তে হয়।
ব্যক্তিগতভাবে আমার দেড় দশকের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, মফস্বলের অনেকেই বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরগুলো খানিকটা রদবদল করে দায়িত্বরত পত্রিকায় প্ররণ করছেন। শনিবারের ঘটনাকে বানিয়ে দিচ্ছেন রোববারের ঘটনা। সকালের ঘটনাকে রাতের। কারো কারো থিয়োরি ৫’এ ২৫। অর্থাৎ ৫ জন আহত হলে ২৫ জনে উন্নীত করে ফেলেন। এ রকম অগণিত ঘটনার জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। আমার প্রশ্ন! পাঠক কাকে, কোন পত্রিকা বা মিডিয়াকে বিশ্বাস করবেন? বিভ্রান্তিতে পড়ে পাঠক। আর আমাদের সংবাদ ও সাংবাদিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সাধারণ মানুষ।
দু’টো কারণ আবিষ্কার হলো। প্রথমতো খবরটি ছাপা হবে এ বিষয়ে খানিকটা নিশ্চিত হওয়া। দ্বিতীয়তো অধিক গুরুত্বসহকারে কভারেজ পাওয়া। এভাবেই হুমকির মুখে পড়ছে মফস্বলের সাংবাদিকতা। পেশার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। দায়ভার কাঁধে গিয়ে পড়ছে গোটা সাংবাদিকসমাজের উপর। ফলে হিংসা-প্রতিহিংসার সৃষ্টি হচ্ছে।
থিয়োরিক্যাল এসব পদ্ধতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। অগত্যা কারো যেনো ক্ষতি না হয়ে যায় এটা সংবাদের মানুষগুলোর বিবেচ্য হওয়া উচিৎ। সংবাদদাতা, সংবাদকর্মী, সাংবাদিক, রিপোর্টার যাই বলিনা কোনো, এসব পেশার মানুষদেরকে হিংসাত্মক মনোভাব পরিহার করতে হবে। সুস্থ্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে হবে। সবার আগে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তাহলেই মহান এই পেশার সুনাম-সুখ্যাতি অক্ষুণœ ও সমুন্নত রাখা সম্ভব হবে।

কৈফিয়ৎ : দীর্ঘ দেড় দশকের অভিজ্ঞতার আলোকে লেখাটি প্রস্তুত করেছি; কাউকেই আক্রমণের হীনমন্যতায় নয়। ব্যক্তিগতভাবে বাক্যজ্ঞানবোধের যথেষ্ট অভাব রয়েছে আমার। বাস্তবতা, অভিজ্ঞতা, উপলব্ধিবোধ ও সীমিত জ্ঞান-চেতনায় এই লেখার মধ্যে যদি কারো ব্যক্তিজীবনের সাথে মিল খুঁজে পান অথবা নিজেকে আবিষ্কার করেন তবে সেটা কাকতালীয়।

আরও দেখুন

কবি সুফিয়া কামাল সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

কবি সুফিয়া কামাল : সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

নারী জাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত। নারী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী। সমাজ ...

Leave a Reply