হোম » মনন » প্রবন্ধ » সময়ের প্রেক্ষাপটে কবি ফররুখ আহমদ_মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
সময়ের প্রেক্ষাপটে কবি ফররুখ আহমদ_মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

সময়ের প্রেক্ষাপটে কবি ফররুখ আহমদ_মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

এ লেখায় বাংলা সাহিত্যে অন্যতম শক্তিমান লেখক এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যে এক ভিন্ন ধারার অন্যতম রূপকার কবি ফররুখ আহমদের কবিতার মান নিয়ে নানা পরশ্রীকাতর সাহিত্য সমালোচকার যে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন তার জবাব দেয়া হয়েছে। কবি র্ফরুখ আহমদ সময়ের দাবীকে চন্দের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন জন সচেতনতার উদ্দেশ্যে। আর এদিকটি উপলব্দি করতে অক্ষম পশ্চিমা জ্ঞাননির্ভর কিছু সাহিত্য সমালোচক, বিশেষ করে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সবার কাছে পরিচিত বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মত দেশের একমাত্র সফল ভ্রাম্যমান পাঠাগারের কল্যাণে। যার মাধ্যমে তরুণ পাঠক তৈরির নিরলস কাজে তিনি নিমগ্ন। তবে একথাও বলতে দ্বিধা নেই তিনি আমার প্রিয় কারণ তার বাচনভঙ্গি বেশ আকর্ষণীয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন মনের মধ্যে যন্ত্রণা দিচ্ছিল, তিনি সত্যিকার অর্থে ‘মধ্যযুগ’ বলতে কী বুঝান এবং ইসলামকে তিনি কিভাবে দেখেন? সাম্প্রতিক সময়ে র্ফরুখ একাডেমী পত্রিকায় তার লেখা “র্ফরুখ আহমদ” শীর্ষক লেখাটি পড়ে বেশ ধাক্কা খেলাম কয়েকটি কারণে। প্রথমত, উল্লেখিত প্রশ্নগুলোর জবাব তিনি না দিয়ে বরং ইসলামকে  ‘মধ্যযুগ’কে বর্বরতার প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত করেছেন বলেই মনে হলো। দ্বিতীয়ত, তিনি মুসলমানদের বিকাশকে “পরিত্যাক্ত মধ্যযুগীয় জীবনব্যবস্থা” হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তৃতীয়ত, বারংবার ফররুখকে স্বাধীনতা পূর্ব ও সময়ের প্রেক্ষাপটে অচল কবি হিসাবে সাহিত্যে ঠাঁই দিয়েছেন। চতুর্থত, তিনি র্ফরুখ আহমদকে “কবি তথা ছোট কবি” হিসাবে নির্ধারণ করেছেন এবং “বড় কবি” হিসাবে তাঁর স্থান সাহিত্য জগতে হবার মতো নয় তা বেশ জোর দিয়েই বলেছেন। পঞ্চমত, র্ফরুখ আহমদকে তিনি “সত্য কবি” হিসাবে দেখেন এবং শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এ স্ববিরোধাত্মক চিন্তা-চেতনা তার মধ্যে কাজ করেছে, তা আমাকে আলোড়িত করেছে এবং সে সব প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্যই এ লেখার প্রয়াস। এখানে আমার সীমাবদ্ধতা যেমন রয়েছে তেমনি সময়ের সাথে নিজেকে বিলিয়ে দেয়াও কঠিন বলে হয়তো কিছু অপূর্ণতা থেকে যাবে।
লেখার শুরুতে তিনি বলেন, “আমাদের যুগে যেসব ধ্যানধারণা ও বিশ্বাসের মধ্যে আমরা বেড়ে উঠেছিলাম তার সঙ্গে ফররুখ আহমদের পার্থক্য ছিল দুস্তুর। এই ব্যবধানকে দুস্তর না বলে বৈরী বলাই ভালো।” কেন তিনি র্ফরুখ আহমদের আদর্শকে বর্তমান সময়ের সাথে “বৈরী” তথা সাংঘর্ষিক মনে করেন? কারণ, র্ফরুখ আহমদ সব মানুষের, সব নিপীড়িতদের কথা বলেন নি। তিনি বিশেষ ধর্মের কথা বলেছেন, যেখানে বর্তমান সমাজ “একালের প্রগতিশীল শ্রেণী সংগ্রামের পথে।” “প্রগতিশীল” বলতে কী বুঝায়?বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে বলা আছে প্রগতিশীল মানে “বর্তমানের পরিবর্তন ও উৎকর্ষ সাধনের ইচ্ছা যাঁরা পোষণ করেন”। এ অর্থে অবশ্যই র্ফরুখ আহমদ প্রগতিশীল এবং আবু সায়ীদরা প্রতিক্রিয়াশীল। আবার যদি প্রগতিশীলতার নামে যদি উন্মাদনা ও সামাজিক অবক্ষয়বাদের উস্কানি দেয়ার প্রতিবাদে কেউ কথা বলেন তিনি তখন অবশ্যই প্রতিক্রিয়াশীল। তাই দ্বিতীয় অর্থে র্ফরুখ আহমদ প্রতিক্রিয়াশীল।
“সিন্দাবাদ” কবিতায় র্ফরুখ আহমদ যখন বলেন,
জড়ো করি লাল, পোখরাজ আর ইয়াকুত ভরা দিন
দরিয়ার বুকে নামিয়াছি ফের বে-দেরেগ সঙ্গিন,
সমুদ্র-সিনা ফেড়ে ছিটে চলে কিশতি, স্বপ্ন সাধ;
নতুন পানিতে সফর এবার, হে মাঝি সিন্দাবাদ!
এখানে কি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ শুনতে পাননি নতুন সফরের ডাক?তিনি কি পরিবর্তনের আহ্বান শোনেননি? বরং এ ডাকে সাড়া নাদিয়ে অভিযোগ করে বললেন, “বড় কবি ছিলেন না ফররুখ, কিন্তু ‘কবি’ ছিলেন”। কেননা তিনি আমাদের  “‘নতুন সফর’, ‘কিশতি’ ‘নোনা দরিয়ার’ কথা বলে সাতচল্লিশ পরবর্তী এদেশের মানুষের মধ্যে যে বোধের সৃষ্টি হয়েছে এবং যে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছে” এবং “তাঁর দেশকাল তাঁর চোখের সামনে দিয়ে নতুন পথে পা বাড়ায়। ফলে পরবর্তী কালের বাংলাদেশের কাব্যযাত্রাও নতুন উত্তরণের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু এই নতুন পালাবদলের পথে ফররুখ আহমদ আর এগিয়ে এলেন না। তাঁর জাতির একালীয় সিন্দাবাদেরা নোনা দরিয়ার নতুন আহবানে সাড়া দিয়ে নতুন সফরের প্রস্তুতি নিল, কিন্তু কবি তাঁর প্রাক্তন অবস্থানে অটল হয়ে রইলেন।”  তাই “ছোট কবি হলেও ‘কবি’ ছিলেন ফররুখ আহমদ। জীবনানন্দ দাশের কথিত সেই ‘কেউ কেউ কবি’দের একজন।” ফলে, “সততার অনমনীয় আলো তাঁকে ‘কবি’ করে তুললেও ‘বড় কবি’র শিরোপা থেকে বঞ্চিত করেছিল।”
অনেক যুক্তি দিয়ে প্রমাণ দিলেন তিনি ফররুখ কবি হলেও ‘বড় কবি’ নন! অতএব সময়ের সাথে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ কবি ্ আহমদ এবং তাকে নিয়ে গবেষণা করা অযথা সময় নষ্ট। কিন্তু এখানেও আবু সায়ীদ বেমালুম ছেপে গেলেন ফররুখের সময়ের কণ্ঠ  “১৯৭৪” নামক কবিতাটি, যা স্বাধীনতা পরবর্তী কালো রাজনীতির কারণে এদেশের শতশত মানুষ মন্বন্তরের শিকার হয়ে কুকুরের মত পথে পথে পড়ে রইলেন তার বাস্তব চিত্র। এ কবিতা একটি সনেটধর্মী। যেখানে তিনি বলেন,
স্বপ্নের অধ্যায় শেষ। দু:স্বপ্নের এ বিন্দি শিবিরি
সাত কোটি মানুষের বধ্যভূমি! দেখ এ বাংলার
প্রতিগৃহে অপমৃত্যু ফেলে ছায়া তিক্ত হতাশার,
দুর্ভিক্ষের বার্তা আসে, আসে বার্তা নিরন্ধ্ররাত্রির।
এর একটু পরেই তিনি এ অন্ধকারের কারণ তুলে ধরেন এভাবে,
এ মুহূর্তে কী উজ্জ্বল রাজধানী!- নতুন শহর
অত্যুগ্র যৌবন মদে মত্তা যেন নটিনী চঞ্চল,
কাটায় উল্লাসে তার জীবনের উদ্দাম প্রহর।
উপচিয়া পড়ে যায় পানপাত্র ফেনিল, উচ্ছল
নির্লজ্জের রঙ্গমঞ্চে অকল্পিত বিলাসের ঘর
দুচোখ ধাঁধানো রূপে; নগ্ন মেকি ঐশ্বর্যে উজ্জ্বল॥
এবার একটু দেখি র্ফরুখের “লাশ” কবিতার দিকে, যেখানে তিনি শুরুতেই বলেন,
যেখানে প্রশস্ত পথ ঘুরে গেল মোড়,
কালো-পিচ-ঢালা রঙে লাগে নাই ধুলির আঁচড়,
সেখানে পথের পাশে মুখ গুঁজে পড়ে আছে জমিনের ’পর;
সন্ধ্যার জনতা জানি কোনোদিন রাখেনা সে মৃতের খবর।
ক্ষুধিত অসাড় তনু বত্রিশ নাড়ির তাপে পড়ে আছে
নিসাড় নিথর,
পাশ দিয়ে চলে যায় সজ্জিত  পিশাচ, নারী নর
Ñ পাথরের ঘর,
মৃত্যু কারাগার,
এ কবিতাতেও তিনি ১৯৭৪ সালের মন্বন্তরের মত ১৯৪৩ সারের মন্বন্তরের কারণ তুলে ধরে বলেন,
পৈশাচিক লোভ
করিছে বিলোপ
শাশ্বত মানব-সত্তা, মানুষের প্রাপ্য অধিকার,
ক্ষুধিত মুখের গ্রাস কেড়ে নেয় রুধিয়া দুয়ার,
মানুষের হাড় দিয়ে তারা আজ করে খেলাঘর;
সাক্ষ্য তার পড়ে আছে মুখ গুঁজে ধরণীর ’পর।
“লাশ” এবং “১৯৭৪” কবিতার সময় কালের মধ্যে বিশাল পার্থক্য কারণ প্রথমটি ব্রিটিশ পাশবিকতার ক্যানভাস। আর দ্বিতীয়টি স্বাধীন বাংলাদেশে ব্যর্থ শাসকের ব্যক্তি লোভের জীবন্ত চিত্র। যদিও কবিতা দু’টির প্রকাশভঙ্গিতে কোনো পার্থক্য নেই, সময়ের পরিবর্তনের প্রতিধ্বনি ঠিকই বেজে ওঠেছে। এরপরও কি বলা চলে র্ফরুখ নতুন কিশস্তি ভাসিয়ে নতুন স্বপ্নের যাত্রা শুরু করেননি? তিনি কি পরিবর্তনকে স্বাগত জানাননি? তবে একথা মানতেই হবে, ব্রিটিশ ‘শকুন’দের (জীবনানন্দ দাশের ‘শকুন’ কবিতা) যে স্বপ্ন নিয়ে তাড়িয়ে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছে, তা অচীরেই ব্যর্থ ও অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ফলে দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম, কিন্তু এখানে ব্যর্থতার কারণে হাজারো মানুষের কাছে মন্বন্তরের জন্য স্বাধীনতাও নিরর্থক হয়েছে। ফলে র্ফরুখ আহমদ বলে ওঠেন, “স্বপ্নের অধ্যায় শেষ!”
এখানে কি কোন ভুল কথা বলেছেন?যদি “স্বপ্নের অধ্যায় শেষ” নাইবা হয় তবে চুয়াত্তরের মন্বন্তরের দায় কার? স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় সাড়ে তিন বছর পর কেন মানুষের মন্বন্তরের মুখোমুখি হতে হলো? কেন স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পার ষোল কোটি মানুষ অসহায়? কেন সব স্বাধীনতা হারিয়ে শাসককূলের নির্যাতনে আতঙ্কিত হয়ে দিন কাটাচ্ছে?
এবার আরেকটি অভিযোগ প্রসঙ্গে র্ফরুখের বাস্তব অবস্থান কি তা পরিস্কার করা দরকার। আবু সায়ীদ মনে করেন “নিজের ধর্ম ছাড়া আর সবাই কার্যত অস্তিত্বহীন হয়ে গিয়েছিল” তাঁর কবিতায়। তিনি কেবল “তাঁর অধঃপতিত দুঃখী জাতিকে উদ্ধারের নিদ্রাহীন উৎকন্ঠা তাঁর অস্থি-মজ্জা-মনন-চেতনাকে এমন নিষ্কৃতিহীনভাবে কামড়ে ধরেছিল যে ঐ বিশেষ জাতির অস্তিত্বের প্রসঙ্গ ছাড়া আর সব কিছুই তাঁর সামনে থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল”। ফলে, “র্ফরুখ আহমদ তাঁর কালের বেদনাকে টের পেয়েছিলেন, সেই দুঃখের উত্তরণকে চিনতে পারেননি। আর এখানেই পরবর্তী অভিযাত্রীদের থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন।”
একজন মানুষ যখন তাঁর পরিপার্শে¦ ঘটে যাওয়া প্রতিনিয়ত অন্যায়-অবিচার-হত্যা-লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে কথা বলে চলেন তখনো কি তিনি সমাজ বিচ্ছিন্ন একজন কবি? যারা প্রেমের উন্মাদনা সৃৃষ্টির মাধ্যমে স্থিতিশীল সমাজকে কেবল অস্থির করে চলেছেন তাদের সমাজের হিতাকাঙ্খী বলার যৌক্তিকতা কি? যেমন তাঁর “‘নিরপেক্ষ’ প্রেমানন্দ গোস্বামীকে” কবিতায় ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে সকল অধর্মের যে মহড়া চলছিল স্বাধীনতার পর তার তীব্র কটাক্ষ করেন। তাঁর মতে,
ধর্ম থেকে আদর্শবাদ, কৃষ্টি এবং সভ্যতা,
ধর্মনিরপেক্ষ দেশে পালিয়ে বেড়ায় ভব্যতা!
বড়াই তবু কমে না তার, তাকায় যখন এক চোখে;
শালীনতার মানলে শাসন কোথায় থেকে নব্যতা।
অথবা “দুই বিড়ালের কথা” কবিতায় যারা সমাজের তোষামদকারী এবং পা ছাটা বিশেষ প্রজাতির মানুষ তাদের কটাক্ষ করে বলেন,
নামের কাঙাল ছিল না তো ঐ হুলো বিড়াল,
এ কুনো বিড়াল মাছের সঙ্গেই নামও চায়,
পা চাটার গুণে এখানে সেখানে খ্যাতিও পায়;
উল্লেখিত লাইনগুলোতে কবি ফররুখ আহমদ যেসব মানুষের কথা বলেছেন তারা কি আজ বিলীন, না তাদের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে এ যেমন মুক্তিযুদ্ধের সময় যিনি তিন বছর শিশু হয়েও মুক্তিযুদ্ধের সনদ নিয়ে সচিব হয়ে দেশ চালান, তখন তাদের ক্ষেত্রে কি তার এই কবিতার কোনো আবেদন নেই?
আজকে স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছর পর সবার জানা এদেশে এক ব্যক্তির কথায় সব আমলা-মন্ত্রীরা উঠেন আর বসেন। তারা বিবেকের দাসত্বে বন্দী। তাদের জাগিয়ে তোলার জন্য “টুকরো কবিতা” শীর্ষক ‘গোলামী স্বভাব’ অংশে তিনি বলেন,
গোলামীতে যদি করে কেউ গৌরব,
কে বোঝাবে তাকে আজাদীর সৌরভ?
আঁকড়িয়ে থাকে দাগের চিহ্নগুলো
কানে দেয় তুলো’ পিঠে খাশা বাঁধে কুলো॥
অথবা ‘তৈল’ অংশে যখন বলেন,
তৈল মর্দনের ধারা প্রচলিত এখানে, কেননা
এ মাঠে দেখেছি ঢের শ্রম-বিমুখের আনাগোনা।
উপরন্তু এ অঞ্চলের ভাগ্যবান আচেন দেদার
যাঁদের তৈলাক্ত মু- করে যোগ্য, অযোগ্য বিচার॥
এভাবে আমরা যদি তাঁর সমগ্র কাব্যগুলোর দিকে তাকাই তবে দেখতে পাবো তিনি কালোত্তীর্ণ এবং সময়ের প্রেক্ষাপটে সচল কবিতা রচনা করে প্রতিনিয়ত মানুষের মনকে নাড়া দিয়ে গেছেন। সেখানে তিনি কোন বিশেষ ধর্মের মানুষের জাগরণ কামনা করেননি। তবে একথা স্বীকার করি তিনি ১৯৪৩ পরবর্তী সময়ে নিজেকে পরিবর্তন করে ইসলামের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সাম্যবাদকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে মানুষের মুক্তি কামনা করেছেন। উল্লেখ্য তাঁর “সিরাজুম মুনিরা” একটি প্রতিকধর্মী কবিতা যেখানে মানুষের অন্যায়-পাপ-অমঙ্গল কর্মকা- থেকে সত্যের ও আলোর পথে আনতে সিরাজুম মুনীরার মত একজন কা-ারী দরকার, যা তিনি এখানে উল্লেখ করেছেন । কিন্তু যারা আলেকজান্ডার, অথবা হিন্দু ও গ্রীক পুরাণ কাহিনী থেকে কোন ত্রাতাকে পৃথিবীর বুকে আহবান জানান মুক্তির জন্য তখন তাদের কেন প্রগতিশীল বা আধুনিক বলে থাকি?
পরিশেষে আরেকটি বিষয়কে আলোকপাত করতে চাই, তা হলো আবু সায়ীদের মতে রবীন্দ্রনাথ শ্রেষ্ঠ। কারণ তাঁর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের শৈল্পিক ও বিষয়বস্তুর এবং আঙ্গিকতার বৈচিত্র। কিন্তু র্ফরুখ এক গ-ির মধে ঘুরে বেড়িয়েছেন বলে কোন বৈচিত্র তাঁর কাব্যে নেই। র্ফরুখ প্রেমের কবিতা লিখেছেন, জারগরণের কথা বলেছেন, উত্তর-উপনিবেশের কথা বলেছেন, ভাষা শহীদরে অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। তার চেয়ে বেশী উল্লেখযোগ্য বিশ্ব সাহিত্যে তিনি নতুন জিনিস সংযোজন করেছেন, তা হলো ব্যঙ্গাত্মক সনেট লিখেছেন অসংখ্য। একাজটি খোদ রবীন্দ্রনাথও পারেননি। তবে কিসের ভিত্তিতে তাঁকে বৈচিত্রহীন কবি বলা হয়?
লেখার ইতি টানবো একথা বলে, র্ফরুখ বাংলা সাহিত্যে নিজস্ব বলয় তৈরি চেষ্টা করেছেন, সব ক্ষেত্রে সফল না হলেও অর্জন করেছেন অনেক। আর সে অর্জনে যারা ঈর্ষাকাতর তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই পিছনে থাকবে এটাই স্বাভাবিক! এছাড়া যারা কবিতার সাগরে সাঁতার কেটেও কবিতার রূপক ও দ্যোতনা এবং অন্তনিহিত অর্থকে ইচ্ছে করেই ছেপে রাখেন তাদের প্রতি আমাদের কেবল করুণা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। আশাকরি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাবেন এবং ফররুখ সম্পর্কে তার উপলব্ধির নতুন নতুন মাত্রা যোগ করবেন।

আরও দেখুন

কবি সুফিয়া কামাল সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

কবি সুফিয়া কামাল : সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

নারী জাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত। নারী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী। সমাজ ...

Leave a Reply