হোম » কথামালা » স্মৃতিকথা » স্মৃতিতে সোনালি শৈশব ও ব্রাহ্মণগাঁও হাইস্কুল_এম মাহমুদ খান
স্মৃতিতে সোনালি শৈশব ও ব্রাহ্মণগাঁও হাইস্কুল_এম মাহমুদ খান

স্মৃতিতে সোনালি শৈশব ও ব্রাহ্মণগাঁও হাইস্কুল_এম মাহমুদ খান

এক.

“কোথাও আমার হরিয়ে যাওয়ার নেই মানা”!
উরন্ত-দুরন্ত শৈশব আমার পুরোটাই কেটেছে জন্মভিটা ‘মশদগাঁওয়ে’। (পূর্বের ঢাকা জেলার লৌহজং থানা) বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলা। কালের আবর্তে সবকিছুর পরিবর্তন অনিবার্য। যেমনি শৈশব-কৈশোর-যৌবন থেকে বৃদ্ধ । সবই চলে মহান স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার আদেশক্রমে। শৈশবকাল যেমন ভুলবার নয়; তেমনি হাজারো ইচ্ছা হলেও সেই ছেলেবেলায় ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও কেনো যেনো প্রায়ই মনে পড়ে সোনালী শৈশবের সেইসব বর্ণালী দিনগুলোর কথা!

খুব ভোরে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনিতে ঘুম ভাঙা। ফজরের নামাজ মসজিদে আদায় করা। নামাজ শেষে মক্তবে পড়া। একটু সকাল হলে স্কুলে যাওয়া। ক্লাস শেষে দলবেঁধে বাড়ি ফেরা।

বিকেলে খেলার মাঠে হাডুডু-দারিয়াবাধা, ডাংগুলি, গোল্লাছুট, ফুটবল, হাতে তৈরী কাঠের ব্যাট আর টেনিস বলে ক্রিকেট খেলা, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি কোনো খেলা খেলতে বাদ যেতো না। একদিন খেলার মাঠে না যেতে পারার কী যে কষ্ট ছিল; তা বলে বুঝানো যাবে না।

বর্ষায় নৌকা অথবা কলা গাছের ভেলায় চড়া। ছুটির দিনে পুল অথবা গাছের ডাল থেকে পানিতে লাফিয়ে পড়া। বড়শী আর জাল দিয়ে মাছ ধরা।
আহা! সে এক ভিন্ন অনুভূতি! অন্যরকম ভালোলাগা!

বাসা থেকে কত-শত বাধা-নিষেধের পরও নাটাই আর গুড়ি নিয়ে মাঠে দৌড়ানোর স্মৃতি কী সহজেই ভোলা যায়!

বাল্যবেলার বাল্য-বন্ধুদের খুব মিস করি। খুব মনে পড়ে তাদের কথা। কখনোবা একাকীত্বে, শৈশব-ভাবনায় চোখ ভিজে নোনাজলে। নিজের অজান্তেই গুনগুন করি, “ও বন্ধু! তোদের মিস করছি ভীষণ।”

বাবাকে হারিয়েছি খুব ছোট বেলাতেই। মা এবং বড় ভাইদের কঠোর শাষন আর নিয়ম-নীতি কখনো কখনো শৈশবের দুরন্তপনার কাছে হার মানত বটে, এর জন্যে সাজাও পেতে হতো! পরক্ষণেই ভুলে যেতাম সাজা আর বাধা-নিষেধের কথা। কথায় বলে, “এটা নাকি বয়সের দোষ!” “ওরে নবীন! ওরে আমার কাঁচা! ওরে সবুজ! ওরে আমার অবুঝ! আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা!”

মেঘে মেঘে বেলা হয়ে যাচ্ছে। আর এখন আমি প্রবাসে। যান্ত্রিক জীবনের খানিক অবসরে, ভাবনায়, চলে যাই সেই মধুমাখা শৈশবে।

দুই.

ব্রাহ্মণগাঁও হাইস্কুল। পুরো নাম ব্রাহ্মণগাঁও বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়।প্রতিষ্ঠাকাল ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দ। মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজংয়ের ঐতিহ্যবাহী ব্রাহ্মণগাঁও হাইস্কুলটি ইতোমধ্যেই শতবছর অতিক্রম করেছে। অগুনতি গুণীজন, সমাজপতি, শিল্পপতি ও রাজনীবিদের সু-শিক্ষার বাহক এ বিদ্যাপীঠ। ভিন্ন ভিন্ন পেশা নিয়ে বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে আছেন ব্রাহ্মনগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
আমি এক হতভাগা! বেছে নিয়েছি প্রবাসজীবন। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে উন্নত বিশ্বের দেশ ও পরাশক্তি ফ্রান্সে বসবাস করলেও, মন কাঁদে শুধু দেশের জন্যে, মা-সহ পরিবারের অন্যান্যদের জন্যে, হারিয়ে যাওয়া শৈশব-কৈশোরের জন্যে। মনে পড়ে; খুব মনে পড়ে– ছেলেবেলার দিনগুলোর কথা, স্কুলের সহপাঠী-বন্ধুদের কথা– (মনির/কাজল/ডলার/সবুর/আবু কালাম/কামরুল/কামাল/মাসুদ/ হারুন/রেজাউল/গুলজার/ মুক্তি/শিলা/ আনোয়ার/ জুয়েল সহ আরো অনেকের কথা)।

গুরুজন শিক্ষকদের কথা– (কমিরউদ্দিন স্যার/ আজিজুল স্যার/ সাধন স্যার/জামাল স্যার/অতুল স্যার/জব্বার স্যার/ আহমাদউল্লাহ হুজুর/মনির স্যার/ রোকন স্যার আরো অনেকের কথা)। সর্বোপরি প্রিয় ব্রাহ্মণগাঁও হাইস্কুলের কথা।
শহীদ মিনারে প্রভাতফেরি। ক্লাসের মাঝে টিফিন প্রিয়ডে কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে, মওলার দোকানের– ঝালমুড়ি কিংবা বাদাম, প্রদীপের দোকানের– হটপেটিস/ক্রিমরোল/ বাটারবন।
ফুটবল মাঠে– গোল্লাছুট/ ফুটবল/ ভলিবল/ হ্যান্ডবল।
নৌকা পারাপারে নৌকাডুবি– কোনো কিছুই ভুলবার নয়।

আশির দশকে ৫ম শ্রেণিতে ভর্তির মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মনগাঁও হাইস্কুলে আমার পদচারণা। যতটুকু মনে পড়ে, রুহুল আমিন স্যার নামে এক ভদ্রলোক প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। যিনি সকলের শ্রদ্বাভাজন সুলতান আহমদ স্যারের অনুপস্থিতিতে দায়িত্বরত ছিলেন। রুহুল আমিন স্যার স্থায়ী না হওয়ায় শফিকুল ইসলাম স্যার প্রধান শিক্ষক হয়ে ব্রাহ্মনগাঁও হাইস্কুলে আসেন। শফিক স্যার ছিলেন কঠোর মনের মানুষ কিন্তু মেধাবী। স্কুল সম্মুখে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে আমার অনুপস্থিতি এবং শফিক স্যারের প্রদত্ত সাজা প্রাপ্তি– আজও মনে পড়ে। যদিও বৃক্ষরোপণের পূর্ব প্রস্তুতিতে আমার অংশগ্রহণ ছিল। তারপরও বৃক্ষরোপণের দিন আমার অনুপস্থিতি– যা ছিল ভাগ্যের নির্মম পরিহাস!
শফিক স্যার দীর্ঘস্থায়ী হননি। পরবর্তীতে শুনেছি তিনি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বরত অবস্থায় তিনবার মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষকের পুরস্কার পেয়েছে। অতঃপর আগমন শ্রদ্ধেয় জয়নাল আবেদীন স্যারের। তিনি ছিলেন পিতৃতুল্য মমতাভরা একজন আদর্শ শিক্ষক। তাঁর শাসনগুলো ছিল হাস্যোজ্জ্বল। ছাত্রদের ক্লাস ফাঁকি ও স্কুল থেকে পালানো রোধে, প্রথম প্রিয়ড ও সর্বশেষ প্রিয়ড এমনকি কখনো কখনো টিফিন প্রিয়ডের পরবর্তী ক্লাসে হাজিরা ডাকতেন!

দিন- সপ্তাহ-মাস পেরিয়ে, বছরের পর বছর! অনেক স্মৃতিই এখন হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। ব্যস্ততায়, দূরত্বে। অনেককিছুর সাধ থাকলেও; সাধ্য হয় না। শত চেষ্টাতেও খুঁজে পাই না অনেকের খোঁজ-খবর কিংবা ঠিকানা।

আরও দেখুন

কবি সুফিয়া কামাল সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

কবি সুফিয়া কামাল : সাহিত্য ও নারী আন্দোলন_আরিফ চৌধুরী

নারী জাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত। নারী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী। সমাজ ...

Leave a Reply